খাদ্য মানুষের মৌলিক অধিকার। অথচ বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে একদিকে মানুষ খাদ্যসংকট ও অপুষ্টির সঙ্গে লড়ছে, অন্যদিকে বিপুল পরিমাণ খাদ্য নানা কারণে নষ্ট ও অপচয় হচ্ছে। এই বৈপরীত্যকে কেবল সামাজিক অসচেতনতার বিষয় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। খাদ্যের অপচয় এখন অর্থনীতি, কৃষি, জনস্বাস্থ্য, পরিবেশ এবং জাতীয় খাদ্যনিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা।
বাংলাদেশের বাস্তবতায় মূল্যস্ফীতি, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, অর্থনৈতিক চাপ ও খাদ্যব্যয়ের ঊর্ধ্বগতি মানুষের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে। এমন পরিস্থিতিতে উৎপাদিত খাদ্যের একটি অংশ যদি দুর্বল সংরক্ষণব্যবস্থা, পরিবহন সংকট, সরবরাহব্যবস্থার ত্রুটি কিংবা অপ্রয়োজনীয় ভোগের কারণে নষ্ট হয়, তাহলে সেটিকে নিছক ব্যক্তিগত অপচয় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি জাতীয় সম্পদের ক্ষতি।
জাতিসংঘের পরিবেশ কর্মসূচি (UNEP) প্রকাশিত Food Waste Index Report 2024-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে বিশ্বে প্রায় ১০৫ কোটি টন খাদ্য অপচয় হয়েছে। ভোক্তার জন্য সরবরাহকৃত খাদ্যের প্রায় ১৯ শতাংশ গৃহস্থালি, খাদ্যসেবা ও খুচরা পর্যায়ে অপচয় হয়েছে। এর মধ্যে গৃহস্থালি পর্যায়ে প্রায় ৬৩ কোটি ১০ লাখ টন, খাদ্যসেবা খাতে ২৯ কোটি টন এবং খুচরা পর্যায়ে প্রায় ১২ কোটি টন খাদ্য অপচয় হয়েছে।
এ অবস্থায় শুধু কত খাদ্য উৎপাদন হচ্ছে, সেই হিসাব যথেষ্ট নয়। উৎপাদিত খাদ্যের কত অংশ নিরাপদে সংরক্ষণ করে মানুষের খাবারের টেবিলে পৌঁছানো যাচ্ছে, সেটিও জাতীয় খাদ্যনীতির গুরুত্বপূর্ণ সূচক হওয়া প্রয়োজন।
খাদ্যক্ষয় ও খাদ্য অপচয়ের মধ্যেও পার্থক্য রয়েছে। উৎপাদনের পর সংগ্রহ, সংরক্ষণ, পরিবহন ও বাজারজাতকরণের বিভিন্ন পর্যায়ে খাদ্য নষ্ট হওয়াকে খাদ্যক্ষয় বলা যায়। অন্যদিকে পরিবার, দোকান, হোটেল, রেস্টুরেন্ট কিংবা সামাজিক অনুষ্ঠানে ব্যবহারযোগ্য খাবার ফেলে দেওয়া খাদ্য অপচয়ের মধ্যে পড়ে। কারণ আলাদা হলেও উভয়ের ফল একই—দেশের খাদ্যসম্পদ কমে যায় এবং খাদ্য উৎপাদনের সঙ্গে ব্যবহৃত জমি, পানি, শ্রম, সার, জ্বালানি ও অর্থেরও অপচয় ঘটে।
বাংলাদেশে খাদ্যক্ষয়ের একটি বড় অংশের শুরু কৃষকের মাঠ থেকে। পর্যাপ্ত সংরক্ষণাগারের অভাব, পরিবহন সমস্যা, বাজারে অতিরিক্ত সরবরাহ এবং ন্যায্য মূল্য না পাওয়ার কারণে অনেক কৃষিপণ্য নষ্ট হয়। এতে একদিকে কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হন, অন্যদিকে শহরের ভোক্তাকে একই পণ্য বেশি দামে কিনতে হয়। তাই কৃষি উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি উৎপাদিত পণ্য সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণের সক্ষমতা বাড়ানোও খাদ্যনিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
সামাজিক অনুষ্ঠান, বিয়ে, বুফে, হোটেল-রেস্টুরেন্ট ও বিভিন্ন আয়োজনে খাদ্য অপচয়ের চিত্রও চোখে পড়ে। প্রয়োজনের তুলনায় বেশি খাবার প্রস্তুত করা, প্লেটে অতিরিক্ত খাবার নেওয়া এবং পরে তা ফেলে দেওয়া অনেক ক্ষেত্রেই অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। প্রয়োজন অনুযায়ী খাবার নেওয়া এবং প্রয়োজন হলে দ্বিতীয়বার নেওয়ার অভ্যাস গড়ে তোলা এ ক্ষেত্রে সহজ একটি সমাধান হতে পারে। আতিথেয়তার মর্যাদা খাবারের পরিমাণে নয়, বরং আন্তরিকতা ও যত্নে।
তবে শুধু নাগরিক সচেতনতা বাড়ালেই হবে না; প্রয়োজন প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিও। বড় হোটেল, রেস্টুরেন্ট, ক্যাটারিং প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং বড় অনুষ্ঠান ব্যবস্থাপনায় কত খাবার প্রস্তুত হচ্ছে, কতটা পরিবেশন করা হচ্ছে এবং কতটা অব্যবহৃত থাকছে—তার হিসাব রাখা সম্ভব। সরকারি প্রতিষ্ঠানেও খাদ্য ব্যবহারের রেকর্ড রাখা প্রয়োজন। জনগণের অর্থে কেনা খাদ্যও জনগণের সম্পদ।
খাদ্য অপচয় কমাতে প্রথমেই প্রয়োজন এর সঠিক পরিমাপ। যে ক্ষতি সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য নেই, তা কমানোর কার্যকর পরিকল্পনাও করা কঠিন। এ জন্য বাংলাদেশে জাতীয় খাদ্য অপচয় ডাটাবেস গড়ে তোলা যেতে পারে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, স্থানীয় সরকার, বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানকে সম্পৃক্ত করে প্রতিবছর কোন পর্যায়ে কত খাদ্য নষ্ট হচ্ছে এবং এর প্রধান কারণ কী—তা নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
এর পাশাপাশি চালু করা যেতে পারে জাতীয় খাদ্য অপচয় সূচক। উৎপাদন, সংরক্ষণ, পরিবহন, বাজারজাতকরণ, খুচরা বিক্রি, খাদ্যসেবা ও গৃহস্থালি পর্যায়ে খাদ্যক্ষয় ও অপচয়ের পরিমাণ এতে পরিমাপ করা যেতে পারে। এতে খাদ্যনীতিতে নতুন একটি প্রশ্ন যুক্ত হবে—কত খাদ্য উৎপাদন করা হয়েছে, তার পাশাপাশি কত খাদ্য রক্ষা করা সম্ভব হয়েছে?
২০৩০ সালকে সামনে রেখে দেশের বাস্তবতা ও নির্ভরযোগ্য ভিত্তিবর্ষের ওপর খাদ্য অপচয় কমানোর একটি পরিমাপযোগ্য জাতীয় লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা প্রয়োজন। জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা ১২.৩-এর সঙ্গেও এ উদ্যোগকে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা যেতে পারে।
লক্ষ্য নির্ধারণের পাশাপাশি প্রতিবছর জাতীয় খাদ্য অপচয় প্রতিবেদন প্রকাশ করা জরুরি। এতে কত খাদ্য নষ্ট হয়েছে, কোন পর্যায়ে ক্ষতি বেশি, আগের বছরের তুলনায় অপচয় কতটা কমেছে এবং নিরাপদ উদ্বৃত্ত খাদ্যের কত অংশ পুনর্বণ্টন করা হয়েছে—এসব তথ্য প্রকাশ করা যেতে পারে। এতে খাদ্য অপচয় আর অনুমাননির্ভর আলোচনার বিষয় থাকবে না; বরং এটি পরিণত হবে জবাবদিহির একটি পরিমাপযোগ্য সূচকে।
সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকেও এ ব্যবস্থার আওতায় আনা যেতে পারে। হাসপাতাল, বিশ্ববিদ্যালয়, আবাসিক প্রতিষ্ঠান, কারাগার, প্রশিক্ষণকেন্দ্র এবং বড় সরকারি অনুষ্ঠানে খাবারের ব্যবহার ও অপচয়ের হিসাব রাখা প্রয়োজন। কোথাও অতিরিক্ত খাবার প্রস্তুত হলে তার কারণ এবং নিরাপদ অব্যবহৃত খাবারের ব্যবস্থাপনার তথ্য সংরক্ষণ করা যেতে পারে। এটি অতিরিক্ত প্রশাসনিক বোঝা নয়; বরং জনগণের অর্থের সঠিক ব্যবহারের অংশ।
একই সঙ্গে কৃষকের মাঠ থেকে খাদ্য নষ্ট হওয়ার হার কমাতে গ্রাম ও উপজেলা পর্যায়ে সংরক্ষণাগার, কোল্ড স্টোরেজ, উন্নত প্যাকেজিং, দ্রুত পরিবহন ও কার্যকর বাজারসংযোগ বাড়াতে হবে। কৃষককে শুধু উৎপাদনের দায়িত্ব দিলেই হবে না; উৎপাদিত পণ্য নিরাপদে বাজারে পৌঁছানো এবং ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করাও খাদ্যনিরাপত্তার অংশ।
নিরাপদ উদ্বৃত্ত খাদ্য পুনর্বণ্টনের জন্য একটি জাতীয় কাঠামো গড়ে তোলা যেতে পারে। বড় হোটেল, রেস্টুরেন্ট, ক্যাটারিং প্রতিষ্ঠান ও বিভিন্ন অনুষ্ঠান থেকে অব্যবহৃত নিরাপদ খাবার যথাযথ স্বাস্থ্যবিধি মেনে খাদ্যনিরাপত্তাহীন মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করা সম্ভব। স্থানীয় প্রশাসন, সিটি করপোরেশন, সামাজিক সংগঠন ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এতে যুক্ত হতে পারে। তবে নিরাপদ উদ্বৃত্ত খাবার ও নষ্ট খাবারের পার্থক্য কঠোরভাবে বজায় রাখতে হবে।
খাদ্য অপচয় রোধের সঙ্গে নৈতিক ও ধর্মীয় শিক্ষারও সম্পর্ক রয়েছে। পবিত্র কোরআনে অপচয় থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। মসজিদ, মাদ্রাসা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সামাজিক সংগঠন ও গণমাধ্যমের মাধ্যমে খাদ্য অপচয়বিরোধী সচেতনতা আরও বাড়ানো যেতে পারে। তবে সচেতনতার পাশাপাশি কার্যকর রাষ্ট্রীয় নীতি ও প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিও নিশ্চিত করতে হবে।
খাদ্যনিরাপত্তার সঙ্গে জনস্বাস্থ্যের সম্পর্কও গভীর। দীর্ঘস্থায়ী খাদ্যাভাব ও অপুষ্টি মানুষের স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। অন্যদিকে অনিরাপদ খাবারও জনস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকি তৈরি করে। তাই উদ্বৃত্ত খাবার পুনর্বণ্টনের ক্ষেত্রে খাদ্য নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্যবিধিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।
বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, খরা কিংবা বাজারে সরবরাহ সংকটের সময় জাতীয় খাদ্য মজুত কতদিনের জরুরি চাহিদা পূরণ করতে পারবে, তারও নিয়মিত মূল্যায়ন প্রয়োজন। খাদ্যনিরাপত্তাকে শুধু উৎপাদনের সঙ্গে না দেখে সংরক্ষণ, সরবরাহ, বাজার ও জরুরি মজুত ব্যবস্থার সমন্বিত কাঠামোর মাধ্যমে বিবেচনা করতে হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, খাদ্যের অপচয়কে জাতীয় সম্পদের অপচয় হিসেবে দেখা। কৃষক খাদ্য উৎপাদনে শ্রম ও অর্থ ব্যয় করেন। সেচে পানি ও বিদ্যুৎ ব্যবহৃত হয়, পরিবহনে জ্বালানি লাগে এবং বাজারজাতকরণে রাষ্ট্রীয় ও বেসরকারি অবকাঠামো ব্যবহৃত হয়। সেই খাদ্য যদি কোনো পর্যায়ে নষ্ট হয়ে যায়, তাহলে শুধু খাবার নয়—এর সঙ্গে যুক্ত বহু সম্পদেরও অপচয় ঘটে।
তাই এখন কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর খোঁজা জরুরি—দেশে প্রতিবছর মোট কত খাদ্য নষ্ট হচ্ছে, কোন পর্যায়ে ক্ষতি সবচেয়ে বেশি, কোন কৃষিপণ্য বেশি নষ্ট হচ্ছে, সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে খাদ্য অপচয়ের হিসাব কীভাবে রাখা হচ্ছে, নিরাপদ উদ্বৃত্ত খাদ্য পুনর্বণ্টনের কাঠামো কতটা কার্যকর এবং ২০৩০ সালের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে প্রতিবছর কতটা অগ্রগতি হচ্ছে?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর জনগণের জানার অধিকার রয়েছে। কারণ খাদ্য শুধু ব্যক্তিগত ভোগের বিষয় নয়; এর সঙ্গে কৃষকের শ্রম, রাষ্ট্রীয় অবকাঠামো, প্রাকৃতিক সম্পদ, জ্বালানি, পরিবহন ও মানুষের অর্থ জড়িত। খাদ্য অপচয় কমানো গেলে কৃষকের উৎপাদনের মূল্য রক্ষা, বাজারব্যবস্থার দক্ষতা বৃদ্ধি, খাদ্যনিরাপত্তা শক্তিশালী করা এবং পরিবেশের ওপর চাপ কমানো সম্ভব।
লায়ন মো. গনি মিয়া বাবুল বলেন, খাদ্যের অপচয় রোধ শুধু অর্থনৈতিক সাশ্রয়ের বিষয় নয়; এটি মানবিক, সামাজিক, ধর্মীয় ও পরিবেশগত দায়িত্বও। একদিকে যখন বিপুলসংখ্যক মানুষ ক্ষুধা ও অপুষ্টিতে ভুগছে, অন্যদিকে খাদ্য নষ্ট হওয়া অত্যন্ত উদ্বেগজনক। তাই পরিমিত ক্রয়, সঠিক সংরক্ষণ, খাদ্যের যথাযথ ব্যবহার এবং নিরাপদ উদ্বৃত্ত খাবার দরিদ্র ও অসহায় মানুষের মধ্যে বিতরণের ব্যবস্থা করতে হবে।
তিনি বলেন, পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, সামাজিক সংগঠন এবং রাষ্ট্রকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। জনসচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি কার্যকর আইন ও নীতি বাস্তবায়ন করা গেলে খাদ্যের অপচয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব। সম্মিলিত উদ্যোগের মাধ্যমে খাদ্যনিরাপত্তা জোরদার করে ক্ষুধামুক্ত ও সমৃদ্ধ সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব।
তাই খাদ্যের অপচয় রোধে এখনই প্রয়োজন কার্যকর পদক্ষেপ। উৎপাদনের হিসাবের পাশাপাশি অপচয়ের হিসাবও করতে হবে। খাদ্যের প্রতিটি দানা শুধু খাবার নয়—এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে কৃষকের শ্রম, দেশের সম্পদ, মানুষের অধিকার এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপত্তা।
