আমিনুল ইসলাম হিরো:
একজন সাংবাদিক প্রতিদিন অন্যের কষ্টের গল্প লেখেন। কখনো তিনি নির্যাতিত মানুষের পাশে দাঁড়ান, কখনো অন্যায়ের বিরুদ্ধে কলম ধরেন, কখনো কোনো পরিবারের কান্না পৌঁছে দেন রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের কাছে। অথচ সেই সাংবাদিক নিজেই যখন ভেতরে ভেতরে ভেঙে পড়েন, তখন তাঁর কষ্টের খবর রাখে কে?
সম্প্রতি বরিশালের জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক পুলক চ্যাটার্জির মৃত্যুর ঘটনা এই প্রশ্নটিই সামনে এনেছে। ১১ সেপ্টেম্বর বরিশাল নগরের প্যারারা রোডে দৈনিক সমকালের ব্যুরো কার্যালয় থেকে তাঁর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তিনি ছিলেন সমকালের সাবেক বরিশাল ব্যুরো প্রধান এবং বরিশাল প্রেসক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক। পুলিশ প্রাথমিকভাবে ঘটনাটিকে আত্মহত্যা বলে ধারণা করলেও মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিয়ে তদন্তের কথা জানিয়েছে। ঘটনাস্থল থেকে কয়েকটি হাতে লেখা চিরকুটও উদ্ধার করা হয়েছে।
পরিবার ও সহকর্মীদের বক্তব্যে উঠে এসেছে, ২০২৩ সালের দিকে সমকাল থেকে অব্যাহতি পাওয়ার পর পুলক বেকার ছিলেন এবং হতাশায় ভুগছিলেন। চাকরি না থাকলেও সাবেক কর্মস্থলের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিন্ন হয়নি। তিনি মাঝেমধ্যে সেখানে যেতেন, পত্রিকা পড়তেন, সহকর্মীদের সঙ্গে সময় কাটাতেন। অফিসের একটি বিকল্প চাবিও তাঁর কাছে ছিল।
এই দৃশ্যটি শুধু হৃদয়বিদারক নয়, সাংবাদিকতা পেশার বাস্তবতাকেও নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে। একজন সাংবাদিকের কর্মস্থল কি শুধু তাঁর জীবিকার জায়গা? নাকি দীর্ঘদিনের পেশাগত পরিচয়, সম্পর্ক, আত্মমর্যাদা ও জীবনের একটি বড় অংশের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা একটি জায়গা?
পুলকের মৃত্যুকে কোনো একক কারণে ব্যাখ্যা করা ঠিক হবে না। চাকরি হারানো, অসুস্থতা, আর্থিক সংকট কিংবা ব্যক্তিগত হতাশা যে কোনো বিষয় একজন মানুষের জীবনে প্রভাব ফেলতে পারে। মৃত্যুর প্রকৃত কারণ তদন্তেই নির্ধারিত হবে। কিন্তু এই ঘটনাকে ঘিরে যে প্রশ্নগুলো উঠেছে, সেগুলো উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।
সাংবাদিকতা বাইরে থেকে যতটা মর্যাদাপূর্ণ ও রোমাঞ্চকর মনে হয়, ভেতরের বাস্তবতা অনেক কঠিন। একজন সাংবাদিককে প্রতিদিন সময়ের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে হয়। খবরের পেছনে ছুটতে হয়, কখনো ঝুঁকি নিতে হয়, কখনো প্রভাবশালী ব্যক্তির বিরাগভাজন হতে হয়। একটি প্রতিবেদনের কারণে হুমকি আসতে পারে, মামলা হতে পারে, সামাজিক চাপ তৈরি হতে পারে। আবার কর্মস্থলের অনিশ্চয়তা, বেতন-ভাতা ও পাওনা নিয়ে দুশ্চিন্তাও অনেকের নিত্যসঙ্গী।
সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানও পরিস্থিতির উদ্বেগজনক দিকটি দেখাচ্ছে। হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে ২০০টি ঘটনায় ৩৮৩ সাংবাদিক নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ২৩৪ জন আহত, ৬০ জন লাঞ্ছিত এবং ৪৯ জন হুমকির মুখে পড়েছেন।
এই সংখ্যাগুলো কেবল পরিসংখ্যান নয়। প্রতিটি সংখ্যার পেছনে একজন মানুষ আছেন। তাঁর পরিবার আছে, সন্তান আছে, স্বপ্ন আছে, ভয় আছে, অনিশ্চয়তা আছে। একজন সাংবাদিককে যখন হুমকি দেওয়া হয়, তখন শুধু একজন সংবাদকর্মীই আক্রান্ত হন না; তাঁর পরিবারের নিরাপত্তাবোধও নড়ে যায়।
আর এখানেই সাংবাদিকদের মানসিক স্বাস্থ্যের প্রশ্নটি সামনে আসে। সাংবাদিকদের জন্য আলোচনা সাধারণত হয় নিরাপত্তা, বেতন, চাকরি কিংবা পেশাগত অধিকার নিয়ে। কিন্তু মানসিক চাপ, দীর্ঘস্থায়ী হতাশা, পেশাগত অনিশ্চয়তা কিংবা সংকটের সময় কাউকে কাছে পাওয়ার সুযোগ এসব নিয়ে আলোচনা তুলনামূলকভাবে কম।
একজন সাংবাদিক দিনের পর দিন মানুষের সমস্যা নিয়ে কাজ করেন। কিন্তু তাঁর নিজের সমস্যার কথা বলার জায়গা কোথায়?
চাকরি চলে গেলে তিনি কার কাছে যাবেন? দীর্ঘদিনের পাওনা আটকে থাকলে তাঁর পরিবার কীভাবে চলবে? পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে মামলা বা হুমকির মুখে পড়লে আইনি সহায়তা কে দেবে? অসুস্থ হয়ে পড়লে চিকিৎসার ব্যয় বহনের ব্যবস্থা কী? আর মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হলে তিনি কি নির্ভয়ে বলতে পারবেন ‘আমি ভালো নেই’?
আমাদের গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানগুলোরও এই প্রশ্নগুলো নতুন করে ভাবা দরকার। একজন সাংবাদিককে শুধু সংবাদ তৈরি করার যন্ত্র হিসেবে দেখলে চলবে না। তিনি একজন মানুষ।
তাঁরও অসুস্থতা আছে, পারিবারিক দায় আছে, অর্থনৈতিক সংকট আছে, মানসিক চাপ আছে।
সাংবাদিক সংগঠনগুলোর দায়িত্বও কম নয়। কোনো সাংবাদিক আক্রান্ত হলে বিবৃতি দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো প্রয়োজনের সময়ে পাশে দাঁড়ানো। আইনি সহায়তা, জরুরি আর্থিক সহযোগিতা, চিকিৎসা সহায়তা এবং মানসিক স্বাস্থ্যসেবার জন্য একটি কার্যকর সহায়তা কাঠামো কি তৈরি করা যায় না?
রাষ্ট্রের কাছেও প্রশ্ন আছে। সাংবাদিক নির্যাতনের অভিযোগের দ্রুত তদন্ত ও বিচার যেমন প্রয়োজন, তেমনি গণমাধ্যমকর্মীদের পেশাগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও জরুরি। কারণ স্বাধীন সাংবাদিকতা শুধু সংবিধান, আইন কিংবা নীতিমালার কথায় টিকে থাকে না; এটি টিকে থাকে নিরাপদ পরিবেশে কাজ করতে পারা মানুষের ওপর।
পুলক চ্যাটার্জির মৃত্যু আমাদের জন্য শুধু শোকের সংবাদ হয়ে থাকলে চলবে না। তাঁর জীবনের শেষ সময়ের পরিস্থিতি নিয়ে তদন্ত তার নিজস্ব গতিতে চলবে। কিন্তু সেই তদন্তের পাশাপাশি সাংবাদিক সমাজকেও নিজেদের ভেতরের সংকটের দিকে তাকাতে হবে।
আমরা কি সাংবাদিকের প্রতিবেদন চাই, কিন্তু সাংবাদিক মানুষটির খবর রাখি না? আমরা কি তাঁর কলমের সাহসকে প্রশংসা করি, অথচ তাঁর ভয়, হতাশা ও অনিশ্চয়তার কথা শুনতে চাই না? একজন সাংবাদিক বছরের পর বছর সংবাদপত্রকে সময় দেবেন, কিন্তু চাকরি হারানোর পর তাঁর জন্য কি কোনো নিরাপত্তা থাকবে না? পেশাগত ঝুঁকি নেবেন, কিন্তু বিপদের সময়ে তাঁকে একাই লড়তে হবে কেন?
আর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন একজন সাংবাদিক যখন নীরবে ভেঙে পড়েন, তখন তাঁর পাশে দাঁড়ানোর মতো একটি কার্যকর ব্যবস্থা কি আমরা তৈরি করতে পারব না?
যে সাংবাদিক প্রতিদিন অন্যের কষ্টের খবর সমাজকে জানান, তাঁর নিজের কষ্টের খবর কি আমরা শোনার আগেই তাঁকে হারিয়ে ফেলব?
লেখকঃ সাংবাদিক ও কলাম লেখক।
rofiqul.nayem@gmail.com
০১৭৪৩৯০৪৭৯৩

4777cx? Oh yeah, solid platform. Easy to navigate and a good variety of stuff to do. Worth checking out if you’re looking for a new place to play. More info here 4777cx.
Love the variety of slots available. It feels very fair and the customer support is actually helpful. Give pkxs777 a try!
Solid platform with a fair chance of winning. I’ve tried a few others but this one feels the most honest. gb777game