ঝিনাইগাতীতে ‘পুলিশ পরিচয়ে’ যাত্রী সেজে অটো ছিনতাই,দিনে-দুপুরে অভিনব প্র*তারণা

 

মনিরুজ্জামান মনির- শেরপুর :

ঝিনাইগাতীসহ বিভিন্ন এলাকায় অটোচালকদের মধ্যে এক ধরনের আতঙ্ক ধীরে ধীরে বাড়ছে। আগে চুরি বা ছিনতাইয়ের ঘটনা শোনা গেলেও এখন নতুন এক কৌশল দেখা যাচ্ছে—যাত্রী সেজে অটো ছিনতাই। অনেক ক্ষেত্রে প্রতারকরা নিজেদের পুলিশ বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য পরিচয় দিয়ে সাধারণ মানুষকে ভয় দেখিয়ে তাদের অটোসহ সবকিছু হাতিয়ে নিচ্ছে।

স্থানীয়দের মতে, বর্তমানে মাদকের বিস্তার যেমন বাড়ছে, তেমনি বেড়েছে নানা ধরনের অপরাধ। অটো চুরি, ছিনতাই, প্রতারণা—সব মিলিয়ে একটি বড় চক্র কাজ করছে বলে ধারণা করছেন অনেকে। এই চক্রের সদস্যরা কখনো যাত্রী সেজে, কখনো আবার পুলিশ পরিচয় দিয়ে চালকদের ফাঁদে ফেলছে।

এমনই একটি ঘটনার শিকার হয়েছেন ঝিনাইগাতী এলাকার অটোচালক আনোয়ার। কয়েকদিন আগে অনেক কষ্টে টাকা জোগাড় করে তিনি একটি নতুন অটো কিনেছিলেন। সেই অটো নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই জীবিকা শুরু করেছিলেন তিনি। কিন্তু জীবনের নতুন শুরুটা খুব বেশিদিন স্থায়ী হলো না।

গতকাল সকাল প্রায় ৮টার দিকে আনোয়ার তার অটো নিয়ে বের হন। কিছুক্ষণ পর একজন যাত্রী তার অটোতে ওঠে এবং নকশি যাওয়ার কথা বলে। সবকিছু তখন স্বাভাবিকই ছিল। একজন অটোচালকের কাছে যেমনটা প্রতিদিন ঘটে—যাত্রী ওঠে, ভাড়া ঠিক হয়, তারপর গন্তব্যের দিকে যাত্রা শুরু হয়।

আনোয়ারও ঠিক সেভাবেই যাত্রী নিয়ে নকশির দিকে যেতে থাকেন।

নকশি পার হওয়ার পর, লেবারমোড়ের একটু আগে একটি নিরিবিলি জায়গায় হঠাৎ করেই একটি খয়েরি রঙের প্রাইভেটকার এসে অটোর সামনে থামে। বিষয়টি বুঝে ওঠার আগেই প্রাইভেটকার থেকে চারজন লোক নেমে আসে।

মুহূর্তের মধ্যেই পরিস্থিতি বদলে যায়।

অটোতে আগে থেকে বসে থাকা যাত্রী এবং প্রাইভেটকার থেকে নামা লোকজন একসাথে আনোয়ারকে ঘিরে ধরে। তারা আনোয়ারকে বলতে শুরু করে—
“তুই গাড়ি থেকে নাম। তুই এই মাল বিক্রি করস। তোর কাছে মা*দক আছে।”

এ কথা বলেই তারা আনোয়ারকে অটো থেকে নামতে বাধ্য করে। এরপর প্রাইভেটকার থেকে নামা চারজন লোক অটোতে উঠে তাকে মাঞ্জা দিয়ে ধরে ফেলে। অটোর চাবি নিয়ে নেয় এবং দ্রুত তাকে অটো থেকে সরিয়ে প্রাইভেটকারে তুলে ফেলে।

ঘটনাটি এত দ্রুত ঘটে যে আনোয়ার কিছু বুঝে ওঠার সুযোগই পাননি।

এরপর তাকে নকশি এলাকা থেকে নিয়ে যাওয়া হয় বাকাকুরা এলাকায়। সেখানে গিয়ে তাকে ফেলে রেখে চলে যায় তারা।

ছেড়ে দেওয়ার সময় আনোয়ার তাদের জিজ্ঞেস করেন, “স্যার আমাকে এখানে এনে নামিয়ে দিলেন কেন? বিষয়টা আসলে কি?”

তখন তারা তাকে বলে,
“তোকে ছেড়ে দিলাম। তোর গাড়ি সেখানে পাবি, যেখানে তোকে ধরেছিলাম।”

অটোচালক আনোয়ার জানান, পুরো সময়টাতে তারা নিজেদের পুলিশ পরিচয় দিয়েছিল। তাদের আচরণ, কথা বলার ধরন এবং চেহারা দেখে তার মনে হয়েছে তারা হয়তো আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কেউ। তিনি বলেন, তাদের কোমরের কাছে পিস্তলের মতো অস্ত্রও দেখেছেন, যা দেখে তার মনে হয়েছে সেটি আসল অস্ত্র।

তবে পরে তাকে ছেড়ে দেওয়ার পর তিনি বুঝতে পারেন বিষয়টি আসলে প্র*তারণা হতে পারে।

নতুন অটো কিনে জীবনের নতুন পথ শুরু করা একজন মানুষের জন্য এটি ছিল বড় ধরনের ধাক্কা। প্রতিদিন যাত্রী নিয়ে জীবিকা নির্বাহ করা অটোচালকদের জন্য এমন ঘটনা এখন বড় আতঙ্ক হয়ে দাঁড়িয়েছে।

স্থানীয় অনেক অটোচালকই বলছেন, যাত্রী সেজে প্র*তারণা করার ঘটনা এখন আর বিচ্ছিন্ন নয়। প্রায়ই এমন খবর পাওয়া যায়—যাত্রী নিয়ে বের হয়ে আর অটো নিয়ে বাড়ি ফিরতে পারেননি চালক। অনেককে হেঁটে, ভেজা চোখে বাড়ি ফিরতে হয়েছে।

এই চক্রের সদস্যরা সাধারণত খুব পরিকল্পিতভাবে কাজ করে। তারা যাত্রী সেজে অটোতে ওঠে। তারপর নিরিবিলি জায়গায় নিয়ে গিয়ে হঠাৎ করে নিজেদের পুলিশ বা প্রশাসনের লোক পরিচয় দেয়। এরপর ভয়ভীতি দেখায়, মাদক বা অন্য কোনো অভিযোগ তোলে এবং থা*নায় নিয়ে যাওয়ার কথা বলে চালককে বিভ্রান্ত করে।

সুযোগ পেলেই অটো বা মূল্যবান জিনিস নিয়ে তারা দ্রুত সরে পড়ে।

এ ধরনের ঘটনার কারণে এখন অনেক অটোচালকই অপরিচিত যাত্রী তুলতে ভয় পাচ্ছেন। বিশেষ করে কেউ যদি পাহাড়ি এলাকা বা নিরিবিলি জায়গায় যেতে বলে, তখন অনেকেই দ্বিধায় পড়ে যাচ্ছেন।

ঘটনার পর অটোচালক আনোয়ার নলকুড়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যানকে ফোন করে বিষয়টি জানান। চেয়ারম্যান তাকে বলেন,
“দেশ উন্নত হয়েছে, চোরেরাও উন্নত হয়েছে।”
এরপর তিনি ফোন কেটে দেন বলে জানান আনোয়ার।

আনোয়ার আরও বলেন, ঘটনার পরপরই বিষয়টি থানায় জানানো হয়নি। তবে খুব দ্রুতই তিনি থানায় গিয়ে বিষয়টি জানাবেন বলে জানিয়েছেন।

এ ঘটনার পর স্থানীয়দের মধ্যেও নানা প্রশ্ন উঠছে। যদি সত্যিই কোনো চক্র পুলিশ পরিচয় ব্যবহার করে এভাবে প্রতারণা করে থাকে, তাহলে তা সাধারণ মানুষের জন্য বড় ধরনের হুমকি।

কারণ পুলিশ পরিচয় দিলে সাধারণ মানুষ সাধারণত ভয়ে কিছু জিজ্ঞেস করতে চায় না। অনেক সময় দেখা যায়, কেউ পুলিশ পরিচয় দিলে মানুষ আর প্রশ্ন না করেই তাদের কথা মেনে নেয়।

বাস্তবতায় আরও একটি বিষয় অনেকেই বলছেন—অনেক ক্ষেত্রে যদি কেউ পুলিশের কাছে তাদের পরিচয় জানতে চায়, তখন সাধারণ মানুষের সাথে খারাপ ব্যবহার করা হয় বলেও অভিযোগ আছে। কখনো কখনো গ্রেফতারের হুমকিও দেওয়া হয়।

এই অভিজ্ঞতার কারণেই অনেক মানুষ পুলিশ বা থানার নাম শুনলেই আর কোনো প্রশ্ন করতে সাহস পায় না। তারা মনে করে বেশি কিছু জানতে চাইলে হয়তো উল্টো হে*নস্তার শিকার হতে হতে পারে।

ফলে প্র*তারক চক্রগুলো এই ভয়কেই সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করছে।

তবে এটাও সত্য যে পু*লিশ প্রশাসনের সবাই একরকম নন। অনেক দায়িত্বশীল ও সৎ কর্মকর্তা রয়েছেন যারা নিষ্ঠার সাথে দায়িত্ব পালন করছেন। কিন্তু কিছু মানুষের আচরণ বা আইনের অপব্যবহারের কারণে সাধারণ মানুষের মধ্যে ভয়, সন্দেহ এবং আস্থার সংকট তৈরি হচ্ছে।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে—যদি প্রতারকরা পুলিশের পরিচয় ব্যবহার করে অপ*রাধ করে, তাহলে সাধারণ মানুষ কীভাবে সত্য-মিথ্যা বুঝবে?

এই ঘটনার পর অটোচালক ও সাধারণ মানুষের জন্য একটি সতর্ক বার্তাও উঠে এসেছে।

অপরিচিত কাউকে অটোতে তোলার আগে যতটা সম্ভব সতর্ক থাকা প্রয়োজন। বিশেষ করে কেউ যদি নিরিবিলি জায়গা, পাহাড়ি রাস্তা বা কম চলাচলের এলাকায় যেতে বলে, তাহলে ভালোভাবে যাচাই করা দরকার।

কেউ যদি নিজেকে পু*লিশ পরিচয় দেয়, তাহলে সম্ভব হলে তার আইডি কার্ড বা পরিচয় নিশ্চিত করার চেষ্টা করা উচিত।

কারণ এক মুহূর্তের অসতর্কতা কখনো কখনো জীবনের বড় ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

ঝিনাইগাতীর এই ঘটনাটি এখন শুধু একজন অটোচালকের গল্প নয়। এটি এখন একটি সতর্ক সংকেত—যেখানে অপ*রাধীরা নতুন নতুন কৌশলে সাধারণ মানুষের দুর্বলতাকে ব্যবহার করছে।

আর সেই কারণেই সচেতনতা ও সতর্কতা এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি প্রয়োজন।

3 thoughts on “ঝিনাইগাতীতে ‘পুলিশ পরিচয়ে’ যাত্রী সেজে অটো ছিনতাই,দিনে-দুপুরে অভিনব প্র*তারণা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *