কিশোর গ্যাং, মাদক ও মব জাস্টিস: আইনের সংকট

আমিনুল ইসলাম হিরো:
বাংলাদেশের বর্তমান সামাজিক বাস্তবতায় তিনটি বিষয় ক্রমেই গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে কিশোর গ্যাংয়ের অপরাধপ্রবণতা, মাদকাসক্তির বিস্তার এবং মাদকবিরোধী অভিযানের নামে সংঘটিত মব জাস্টিস। আলাদা মনে হলেও বাস্তবে এই তিনটি বিষয় একে অপরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত এবং পারস্পরিকভাবে পরস্পরকে তীব্র করছে। এর ফলে শুধু আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিই নয়, বরং আইনের শাসন ও সামাজিক আস্থার ভিত্তিও প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে।
দেশের বিভিন্ন শহর ও উপজেলা পর্যায়ে কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা এখন আর বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। পুলিশ ও বিভিন্ন গবেষণামূলক পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, এসব গ্যাংয়ের সদস্যরা মূলত কিশোর ও তরুণ বয়সী। তারা চাঁদাবাজি, ছিনতাই, মারামারি, এলাকায় আধিপত্য বিস্তার এবং সংঘবদ্ধ সহিংসতার মতো অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, পারিবারিক নজরদারির দুর্বলতা, নৈতিক শিক্ষার অভাব, বেকারত্ব এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপরাধ সংস্কৃতির প্রভাব কিশোরদের বিপথগামী করছে।
এই অপরাধপ্রবণতার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত আরেকটি বড় সংকট হলো মাদকাসক্তি। মাদক কেবল ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য সমস্যা নয়, এটি একটি বিস্তৃত সামাজিক ব্যাধি। ইয়াবা, গাঁজা, ফেনসিডিলসহ বিভিন্ন মাদকের সহজলভ্যতা তরুণদের মধ্যে আসক্তি বাড়াচ্ছে। প্রথমে কৌতূহল বা বন্ধুবান্ধবের প্রভাবে শুরু হলেও পরে এটি নিয়ন্ত্রণহীন নির্ভরতায় পরিণত হয়। আসক্ত ব্যক্তি ধীরে ধীরে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে এবং অর্থের প্রয়োজনে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ে।
এই বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরও একটি উদ্বেগজনক প্রবণতা মাদকবিরোধী অভিযানের নামে মব জাস্টিসের অভিযোগ। আইন অনুযায়ী, মাদক নিয়ন্ত্রণ একটি রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব এবং এটি নির্ধারিত আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও বিচারব্যবস্থার মাধ্যমে সম্পন্ন হওয়ার কথা।
বাংলাদেশের মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১৮ অনুযায়ী, মাদক সংক্রান্ত অপরাধের ক্ষেত্রে গ্রেপ্তার, জব্দ, তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়া নির্দিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে সম্পন্ন করতে হয়। সন্দেহভাজন কাউকে আটক করা হলেও তাকে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে আদালতে উপস্থাপন করা বাধ্যতামূলক। একই সঙ্গে তাকে শারীরিক শাস্তি দেওয়া বা অপমান করার কোনো এখতিয়ার কোনো ব্যক্তি বা জনতার নেই।
অন্যদিকে, বাংলাদেশ দণ্ডবিধি, ১৮৬০-এর ৩২৩, ৩২৪, ৩৪৯ ও ৩৫২ ধারা অনুযায়ী কাউকে আঘাত করা, বেআইনিভাবে আটক রাখা বা দলবদ্ধভাবে শাস্তি দেওয়া স্পষ্টভাবে শাস্তিযোগ্য অপরাধ। একাধিক ব্যক্তি একত্রিত হয়ে কাউকে আক্রমণ করলে তা “unlawful assembly” হিসেবেও গণ্য হতে পারে, যার জন্য আইনগত শাস্তির বিধান রয়েছে।
এছাড়া বাংলাদেশের সংবিধানের ৩১ অনুচ্ছেদে বলা আছে—“আইনের আশ্রয়লাভ এবং আইনানুযায়ী আচরণ লাভ প্রত্যেক নাগরিকের মৌলিক অধিকার। অর্থাৎ, অপরাধী হলেও তার বিচার করার একমাত্র অধিকার রাষ্ট্র ও আদালতের; কোনো ব্যক্তি বা জনতার নয়।
কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, কোথাও কোথাও “মাদকবিরোধী অভিযান” বা “ধরা পড়েছে মাদক” ধরনের ঘটনার পর সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে মারধর বা অপমান করার ঘটনা ঘটছে। অনেক ক্ষেত্রে সামাজিক উত্তেজনা ও গুজবের ভিত্তিতে এ ধরনের পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তথ্য যাচাই ছাড়া ছড়িয়ে পড়ায় জনরোষ তৈরি হয় এবং তা দ্রুত সহিংসতায় রূপ নেয়।
মব জাস্টিসের সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক হলো এটি বিচার নয়, বরং আবেগ ও প্রতিক্রিয়ার ওপর ভিত্তি করে ঘটে। এর ফলে অনেক সময় নিরপরাধ মানুষও সহিংসতার শিকার হয়, যা পরবর্তীতে মানবাধিকার লঙ্ঘনের গুরুতর দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হয়।
কিশোর গ্যাং, মাদকাসক্তি এবং মব জাস্টিস একে অপরকে ঘিরে একটি দুষ্টচক্র তৈরি করছে। কিশোররা মাদকের সঙ্গে জড়িয়ে অপরাধে প্রবেশ করছে, সেই অপরাধের বিরুদ্ধে জনরোষ তৈরি হচ্ছে, আর সেই রোষ থেকেই আইনবহির্ভূত সহিংসতা ঘটছে। ফলে সমাজে অপরাধ কমার পরিবর্তে নতুন ধরনের সহিংসতা জন্ম নিচ্ছে।
এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য প্রথমত আইনের শাসনকে কঠোরভাবে প্রতিষ্ঠা করা জরুরি। আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে অবশ্যই সংবিধান ও প্রচলিত আইনের সীমার মধ্যে থেকে দায়িত্ব পালন করতে হবে। কোনো অবস্থাতেই বিচারিক প্রক্রিয়ার বাইরে শাস্তি দেওয়া গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
দ্বিতীয়ত, মাদক নিয়ন্ত্রণে কেবল দমননীতি নয়, প্রতিরোধ ও পুনর্বাসনকে গুরুত্ব দিতে হবে। মাদকাসক্তদের অপরাধী হিসেবে নয়, চিকিৎসার প্রয়োজন আছে এমন ব্যক্তি হিসেবে বিবেচনা করা জরুরি। একই সঙ্গে মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
তৃতীয়ত, জনগণের মধ্যে আইনের প্রতি আস্থা ও সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। অপরাধ ধরা পড়েছে এই ধারণার ভিত্তিতে কেউ যেন আইন নিজের হাতে তুলে না নেয়, সেটি সামাজিকভাবে প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন।
পরিশেষে বলা যায়, কিশোর অপরাধ, মাদকাসক্তি এবং মব জাস্টিস কোনো বিচ্ছিন্ন সমস্যা নয়; এটি একটি আন্তঃসম্পর্কিত সামাজিক ও আইনি সংকট। এই সংকট মোকাবিলায় রাষ্ট্র, পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সমাজ—সব পক্ষের সমন্বিত উদ্যোগ অপরিহার্য। নতুবা আইন রক্ষার নামে আইন ভাঙার সংস্কৃতি আরও বিস্তৃত হবে, যা একটি সভ্য সমাজের জন্য গভীর হুমকি।
একটি সভ্য সমাজের পরিচয় হলো সেখানে অপরাধ সম্পূর্ণভাবে নির্মূল হওয়া নয়, বরং অপরাধ ঘটলে তা আইনের মাধ্যমে ন্যায়সংগতভাবে সমাধান করা। তাই আইনের শাসনকে শক্তিশালী করা, মানবাধিকার রক্ষা করা এবং সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি করাই হতে পারে এই সংকট থেকে উত্তরণের সবচেয়ে কার্যকর পথ।
লেখক: সাংবাদিক ও কলাম লেখক। 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *