এইচএম মোকাদ্দেস,সিরাজগঞ্জ:
কারা হচ্ছেন সিরাজগঞ্জ জেলা বিএনপির আগামীদিনের কান্ডারী।
কে হচ্ছেন সভাপতি কে হবেন সাধারণ সম্পাদক এই নিয়ে চলছে স্থানীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা।
সিরাজগঞ্জ জেলা বিএনপির কাউন্সিলের চূড়ান্ত তারিখ ঘোষনা না হলেও স্থানীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে এখন একটাই আলোচনা আগামী কাউন্সিলে কে হচ্ছেন জেলা বিএনপির সভাপতি, কে হবেন সাধারণ সম্পাদক। বিশেষ করে কেন্দ্রীয় বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর রাষ্ট্রপতি হওয়ায় এবং রিজভী আহমেদ ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব এর দায়িত্ব পাওয়ায় জেলা কমিটি নিয়ে আরো জোরেশোরে আলোচনা হচ্ছে।
আগামী কাউন্সিলে কমিটিতে নতুন কেউ আসবে নাকি পুরাতনরাই থাকবে।
এই সিদ্ধান্তের দিকে এখন নজর সিরাজগঞ্জের তৃণমূলের বিএনপি নেতাকর্মীদের।
সিরাজগঞ্জ জেলা বিএনপির কাউন্সিলকে কেন্দ্র করে স্থানীয় রাজনীতিতে ব্যাপক প্রাণচাঞ্চল্য ও কৌতূহল সৃষ্টি হয়েছে। দীর্ঘদিনের আন্দোলন-সংগ্রাম, মামলা-হামলা, কারাবরণ ও তৃণমূলের রাজনীতিতে পরীক্ষিত নেতারা দলের গুরুত্বপূর্ণ প্রধান দুটি পদ সভাপতি ও ‘সাধারণ সম্পাদক’ পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন এমনটাই আভাস পাওয়া যাচ্ছে।
তবে বর্তমান সভাপতি সাবেক সংসদ সদস্য রুমানা মাহমুদ এর পদে কেউ এখনও প্রতিদ্বন্দ্বিতার কথা না বললেও সাধারণ সম্পাদক পদে একাধিক প্রার্থী হওয়ার গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে। ইতিমধ্যে কেউ কেউ ব্যানার, পোস্টার, ফেস্টুন, প্যানা লাগিয়ে, সংবাদ সম্মেলন করে নিজের প্রার্থীতার ঘোষনা দিচ্ছেন।
এদের মধ্যে রয়েছেন জেলা বিএনপির বর্তমান সাধারণ সম্পাদক ও কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য সাইদুর রহমান বাচ্চু, সহ সভাপতি শ্রী অমর কৃষ্ণ দাস, যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক রাশেদুল হাসান রঞ্জন, সাংগঠনিক সম্পাদক মির্জা মোস্তফা জামান এবং অপর সাংগঠনিক সম্পাদক মোঃ আবু সাঈদ সুইট। দলের দুঃসময়ে রাজপথের ভূমিকা, সাংগঠনিক দক্ষতা ও ত্যাগের খতিয়ান তুলে ধরে তৃণমূল নেতাকর্মীদের সমর্থন আদায়ে ও কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দের সু-নজরে আসার জন্য কেন্দ্রে লবিং চালাতে ব্যস্ত সময় পার করছেন তারা।
এদের মধ্যে রয়েছেন জেলা বিএনপির বর্তমান সাধারণ সম্পাদক সাইদুর রহমান বাচ্চু। প্রায় চার দশকের রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে তিনি ১৯৮৮–৮৯ ও ১৯৮৯–৯০ মেয়াদে সিরাজগঞ্জ সরকারি কলেজে ছাত্রছাত্রীদের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত ছাত্র সংসদের দুই দুইবারের জিএস এবং ১৯৯০-এর গণঅভ্যুত্থানে সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্য পরিষদের আহ্বায়ক ছিলেন।
২০০৩ সালে মূল দলে যোগ দিয়ে শহর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক, পরবর্তীতে জেলা বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এবং ২০১৬ সালে জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক পদে নির্বাচিত হন। বর্তমানে তিনি বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটিরও অন্যতম সদস্য। সাইদুর রহমান বাচ্চু জুলাই আন্দোলনের প্রথম সারির যোদ্ধা। তার যোগ্য নেতৃত্বে দল সুসংগঠিত হয় এবং আন্দোলন সফল হয়। দলের দুঃসময়ে নেতাকর্মীদের সামনে থেকে আন্দোলন সংগ্রাম করতে গিয়ে তার বিরুদ্ধে প্রায় ৬৮টি রাজনৈতিক মামলা হয়। বিভিন্ন সময়ে বন্যা ও দুর্যোগে ত্রাণ, বৃক্ষরোপন, মাদক বিরোধী ক্যাম্পিংসহ বিভিন্ন সামাজিক কার্যক্রমে তাঁর প্রত্যক্ষ উপস্থিতি তাঁকে তৃণমূলের
নেতাকর্মীসহ সাধারণ মানুষের কাছে এক জনপ্রিয় মুখ হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। তৃণমূলের নেতাকর্মীসহ পৌরবাসী তাকে জনতার মেয়র হিসেবে খ্যাতি দিয়েছেন। তৃণমূলের অনেক নেতাকর্মী তার ত্যাগ, সাংগঠনিক দক্ষতা ও দলের প্রতি আনুগত্যের বিবেচনায় তাকেই পুনরায় সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দেখতে চান।
এদিকে সিরাজগঞ্জ জেলা বিএনপির সহ-সভাপতি ভিপি অমর কৃষ্ণ দাস জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক পদপ্রার্থী হয়েছেন। তিনি সিরাজগঞ্জ সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের দুইবার নির্বাচিত সাবেক ভিপি এবং সিরাজগঞ্জ চেম্বার অব কমার্স এন্ড ইন্ডাস্ট্রির সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট।
তিনি ৯০’এর স্বৈরাচার এরশাদ বিরোধী আন্দোলনের সিরাজগঞ্জের জেলার সমন্বয়ক ছিলেন। সিরাজগঞ্জ সদর থানা বিএনপির দুই বারের সাবেক সাধারণ সম্পাদক। দীর্ঘ ১৭ বছর স্বৈরাচার আওয়ামীলীগের বিরুদ্ধে আন্দোলন সংগ্রাম করতে গিয়ে একাধিক বার কারাবরণ করেছেন। তিনি ২০২৪ সালে জুলাই আন্দোলনে সিরাজগঞ্জে সক্রিয়ভাবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি পরিচ্ছন্ন রাজনীতিবিদ হিসেবে নিজেকে একজন যোগ্য প্রার্থী হিসেবে দাবি করেন।
অন্যদিকে ছাত্র রাজনীতির উত্তাল সময় থেকে সক্রিয় রাশেদুল হাসান রঞ্জন চার দশকেরও বেশি সময় ধরে বিএনপির রাজনীতিতে যুক্ত। এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় পাবনা কারাগারে ৯ মাসসহ মোট ৬ বার এবং পরবর্তীতে মোট ২১ বার কারাবরণ করেন। তিনি সিরাজগঞ্জ সরকারি কলেজ ছাত্র সংসদের দুইবার এজিএস, একবার জিএস এবং দীর্ঘ ১২ বছর জেলা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছেন।
রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে দুই শতাধিক মামলার মুখোমুখি হওয়ার কথা উল্লেখ করে রাশেদুল হাসান রঞ্জন বলেন, রাজনৈতিক জীবনে কোনো অনৈতিক কর্মকাণ্ড বা চাঁদাবাজির দাগ তাঁর গায়ে লাগেনি। আগামী দিনের সাংগঠনিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় নিজেকে সাধারণ সম্পাদক পদে একজন যোগ্য ও ত্যাগী প্রার্থী হিসেবে নিজেকে দাবি করেন।
এদিকে সিরাজগঞ্জ জেলা বিএনপির প্রতিষ্ঠাতাকালীন সভাপতি ও সাবেক সংসদ সদস্য মরহুম মির্জা মোরাদুজ্জামানের সন্তান মির্জা মোস্তফা জামানও রয়েছেন সাধারণ সম্পাদক প্রার্থীর তালিকায়। তিনি১৯৯০-এর এরশাদবিরোধী আন্দোলন থেকে রাজনীতিতে সক্রিয় পথচলা শুরু করেন। পরবর্তীতে জেলা ছাত্রদলের সভাপতি এবং বর্তমানে জেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছেন। তাঁর বিরুদ্ধে বিগত দিনের ৪০টি রাজনৈতিক মামলা রয়েছে।
২০০৭ সালে রাজনৈতিক হামলার শিকার হয়ে দীর্ঘদিন জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে থাকা এবং ২০২৪-এর ছাত্র-জনতার আন্দোলনে সামনের সারিতে থাকা এই নেতা বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের সাথে যুক্ত। শহীদ জিয়ার আদর্শ ও পিতার দেখানো পথ অনুসরণ করে তৃণমূল নেতাকর্মীদের আস্থার প্রতীক হিসেবে নিজেকে সাধারণ সম্পাদক পদে একজন শক্তিশালী প্রার্থী হিসেবে দাবিদার মনে করেন তিনি।
জেলা বিএনপির আরেক সাংগঠনিক সম্পাদক মোঃ আবু সাঈদ সুইট ইতিমধ্যে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে সাধারণ সম্পাদক পদে তাঁর প্রার্থিতা ঘোষণা করেছেন। সিরাজগঞ্জ বিএনপির প্রতিষ্ঠাকালীন নেতা মরহুম আব্দুস সালাম তালুকদারের সন্তান আবু সাইদ সুইট এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় ১০ মাস ডিটেনশনে থাকাসহ পরবর্তীতে একাধিকবার কারাবরণ করেছেন।
পূর্বে প্রত্যক্ষ ভোটে সিরাজগঞ্জ জেলা যুবদলের সাধারণ সম্পাদক ও সভাপতি নির্বাচিত হয়ে তিনি সাংগঠনিক দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। ক্রীড়া ও সামাজিক অঙ্গনে সুপরিচিত আবু সাইদ সুইট বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ঘোষিত কর্মসূচি বাস্তবায়ন ও স্থায়ী কমিটির সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুর নেতৃত্বে দলকে ইস্পাত কঠিন ভিত্তির ওপর দাঁড় করানোর প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।
সিরাজগঞ্জ জেলা কাউন্সিলের চূড়ান্ত তারিখ ও সিদ্ধান্তের দিকে এখন নজর সিরাজগঞ্জের সর্বস্তরের বিএনপি নেতাকর্মীদের। স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিগত দিনের রাজপথের ত্যাগ, হামলা মামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া এবং সাংগঠনিক নেতৃত্বের দক্ষতার ওপর ভিত্তি করেই নির্ধারিত হবে সিরাজগঞ্জ জেলা বিএনপির আগামী দিনের নতুন কান্ডারি।
