গুম-খুনের শিকার পরিবার পুনর্বাসনে আলাদা অধিদপ্তর রাষ্ট্রীয় উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছে বাংলাদেশ জাতীয় মানবাধিকার সমিতি

 

নিজস্ব প্রতিবেদক:
গুম, খুন, নির্যাতন, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, পঙ্গুত্ব ও মিথ্যা মামলার শিকার ব্যক্তি এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর কল্যাণ, সুচিকিৎসা, আইনি সুরক্ষা, ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনের লক্ষ্যে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনে পৃথক একটি অধিদপ্তর গঠনের উদ্যোগকে স্বাগত ও অভিনন্দন জানিয়েছে বাংলাদেশ জাতীয় মানবাধিকার সমিতি।

রোববার (২৩ আগস্ট) মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত আন্তঃমন্ত্রণালয় সভায় এ বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা ও নীতিগত উদ্যোগ গ্রহণের পর বাংলাদেশ জাতীয় মানবাধিকার সমিতির চেয়ারম্যান মো. মঞ্জুর হোসেন ঈসা এক বিবৃতিতে সরকারকে অভিনন্দন জানান।
মঞ্জুর হোসেন ঈসা বলেন, “গুম, খুন, নির্যাতন ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার ব্যক্তি এবং তাদের পরিবারগুলোর দীর্ঘদিনের দাবি ও বেদনার প্রতি রাষ্ট্রের এই উদ্যোগ একটি গুরুত্বপূর্ণ স্বীকৃতি। আমরা এই উদ্যোগকে স্বাগত জানাই এবং দ্রুত বাস্তবায়নের দাবি জানাচ্ছি।”
তিনি বলেন, একজন মানুষ গুম বা হত্যার শিকার হলে শুধু একজন ব্যক্তিই ক্ষতিগ্রস্ত হন না; তাঁর পুরো পরিবার অর্থনৈতিক, সামাজিক ও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। অনেক পরিবার বছরের পর বছর স্বজনের সন্ধান, বিচার ও রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির অপেক্ষায় দিন কাটাচ্ছে। অনেক পরিবার উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে নিঃস্ব হয়েছে, সন্তানদের পড়াশোনা বন্ধ হয়েছে এবং পরিবারের সদস্যরা চিকিৎসা ও আইনি সহায়তার অভাবে মানবেতর জীবনযাপন করছেন।
রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতার নতুন অধ্যায়
বাংলাদেশ জাতীয় মানবাধিকার সমিতির চেয়ারম্যান বলেন, ভুক্তভোগী ও তাঁদের পরিবারের পুনর্বাসনের জন্য পৃথক অধিদপ্তর প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ শুধু প্রশাসনিক কাঠামো তৈরির বিষয় নয়; এটি রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতা প্রতিষ্ঠার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
তিনি বলেন, “ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে শুধু এককালীন আর্থিক সহায়তা দিলেই দায়িত্ব শেষ হবে না। তাদের চিকিৎসা, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা, আইনি সহায়তা, শিক্ষা, কর্মসংস্থান, আবাসন এবং সামাজিক পুনর্বাসনের দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থা করতে হবে।”
তিনি আরও বলেন, কোনো ব্যক্তি গুম বা হত্যার শিকার হলে তাঁর পরিবারের সদস্যরা যেন বছরের পর বছর সরকারি দপ্তর থেকে দপ্তরে ঘুরে বেড়াতে বাধ্য না হন, সে জন্য একটি কেন্দ্রীয় ও জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি।
আন্তঃমন্ত্রণালয় সভায় গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা
মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সংবাদ বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, রোববার মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত আন্তঃমন্ত্রণালয় সভায় নতুন অধিদপ্তর প্রতিষ্ঠাসহ ভুক্তভোগী ও তাঁদের পরিবারের অধিকার নিশ্চিত করার বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আযম খান। উপস্থিত ছিলেন প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন এবং মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আশরাফুল ইসলাম।
সভায় মন্ত্রী আহমেদ আযম খান বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষতিগ্রস্তদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে এবং তাঁদের জন্য ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান অধিদপ্তর’ গঠন করা হয়েছে। একইভাবে দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের জন্য যারা গুম, খুন, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, নির্যাতন, পঙ্গুত্ব কিংবা মিথ্যা মামলার শিকার হয়েছেন, তাঁদের ত্যাগকেও রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃতি দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, ভবিষ্যতে কোনো কর্তৃত্ববাদী শক্তি যেন জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার হরণ করতে না পারে এবং কোনো পরিবারকে স্বজন হারানোর পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে না হয়, সে জন্য স্থায়ী প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রয়োজন রয়েছে।
মানবাধিকার ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা
সভায় প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন বলেন, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনার অন্যতম বিষয় ছিল মানুষের স্বাধীনভাবে জীবনযাপন, মানবাধিকার সুরক্ষা, রাষ্ট্রীয় বলপ্রয়োগ বন্ধ এবং প্রত্যক্ষ ভোটাধিকারের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা।
তিনি দাবি করেন, ২০০৯ সালের পর ভোটের অধিকার হরণ, রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের সেই মৌলিক চেতনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
যারা মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে জীবন দিয়েছেন, নির্যাতিত হয়েছেন, গুম হয়েছেন অথবা আর্থিকভাবে নিঃস্ব হয়েছেন—তাদের জন্য রাষ্ট্রের দায়িত্ব রয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
আইন ও ক্ষতিপূরণের দাবি
সভায় মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ‘রুলস অব বিজনেস, ১৯৯৬’-এর ‘সিডিউল-১ (অ্যালোকেশন অব বিজনেস)’ সংশোধন করে নতুন দায়িত্ব মন্ত্রণালয়ের আওতাভুক্ত করার বিষয়ে আলোচনা হয়।
একই সঙ্গে জাতিসংঘের ‘Basic Principles and Guidelines on the Right to a Remedy and Reparation’ এবং বাংলাদেশের সংবিধানের আলোকে ভুক্তভোগী ও তাঁদের পরিবারের অধিকার নিশ্চিত করার বিষয়েও আলোচনা হয়েছে।
নতুন অধিদপ্তর প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি গুম, খুন, নির্যাতন ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার ব্যক্তি ও পরিবারের অধিকার, ক্ষতিপূরণ এবং পুনর্বাসন নিশ্চিত করতে পৃথক আইন প্রণয়ন এবং ‘রুলস অব বিজনেস’ সংশোধনের বিষয়গুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা সভায় বলা হয়েছে।
মঞ্জুর হোসেন ঈসার পাঁচ দফা প্রত্যাশা
নতুন অধিদপ্তরের উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে মঞ্জুর হোসেন ঈসা বলেন, অধিদপ্তরটি যেন কেবল কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ না থাকে। তিনি ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর জন্য কয়েকটি বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান—
প্রথমত, গুম, খুন, নির্যাতন ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের প্রত্যেকটি ঘটনা যাচাই করে একটি জাতীয় ডাটাবেজ তৈরি করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য দ্রুত আইনি সহায়তা ও ন্যায়বিচারের ব্যবস্থা করতে হবে।
তৃতীয়ত, ভুক্তভোগী ও পরিবারের সদস্যদের জন্য বিনামূল্যে চিকিৎসা ও মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে হবে।
চতুর্থত, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর অর্থনৈতিক পুনর্বাসনের জন্য ক্ষতিপূরণ, কর্মসংস্থান, শিক্ষা ও আবাসন সহায়তা চালু করতে হবে।
পঞ্চমত, অধিদপ্তরের কার্যক্রমে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও ভুক্তভোগীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।
‘মায়ের ডাক’সহ ভুক্তভোগী পরিবারের দীর্ঘ অপেক্ষা
মঞ্জুর হোসেন ঈসা বলেন, দীর্ঘদিন ধরে গুম হওয়া ব্যক্তিদের পরিবারগুলো তাঁদের স্বজনের সন্ধান, রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি, বিচার ও পুনর্বাসনের দাবিতে আন্দোলন করে আসছেন। ‘মায়ের ডাক’-এর মতো প্ল্যাটফর্মগুলো বছরের পর বছর নিখোঁজ স্বজনদের পরিবারের পাশে দাঁড়িয়ে তাঁদের কথা তুলে ধরেছে।
তিনি বলেন, “একজন মা, একজন স্ত্রী, একজন সন্তান কিংবা একজন ভাই বছরের পর বছর প্রিয় মানুষটির ফিরে আসার অপেক্ষায় থাকেন। সেই অপেক্ষার যন্ত্রণা কোনো আর্থিক সহায়তা দিয়ে পুরোপুরি পূরণ করা সম্ভব নয়। তাই নিখোঁজ ব্যক্তিদের বিষয়ে সত্য উদঘাটন, পরিবারের ন্যায়বিচার এবং যথাযথ ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করাও রাষ্ট্রীয় পুনর্বাসন ব্যবস্থার অংশ হতে হবে।”
বহুমন্ত্রণালয়ের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন
সভায় মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ, পররাষ্ট্র, জনপ্রশাসন, স্বরাষ্ট্র, অর্থ, আইন ও বিচার, সমাজকল্যাণ, স্বাস্থ্যসেবা, যুব ও ক্রীড়া, শ্রম ও কর্মসংস্থান, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ এবং মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয় ও বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
মঞ্জুর হোসেন ঈসা বলেন, এতগুলো মন্ত্রণালয় ও বিভাগের সমন্বয় নতুন অধিদপ্তরের কাজকে আরও কার্যকর করার সুযোগ সৃষ্টি করবে। তবে বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এড়িয়ে ভুক্তভোগীদের জন্য দ্রুত সেবা নিশ্চিত করতে হবে।
তিনি বলেন, “রাষ্ট্র যদি একজন গুমের শিকার মানুষের পরিবারের পাশে দাঁড়ায়, তাহলে সেই পরিবার শুধু আর্থিক সহায়তা পাবে না—তারা রাষ্ট্রের প্রতি আস্থা ফিরে পাবে। আর রাষ্ট্র যদি ন্যায়বিচার নিশ্চিত করে, তাহলে ভবিষ্যতে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাও প্রতিরোধ করা সহজ হবে।”
দ্রুত বাস্তবায়নের আহ্বান
বাংলাদেশ জাতীয় মানবাধিকার সমিতির চেয়ারম্যান মো. মঞ্জুর হোসেন ঈসা সরকারের এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে দ্রুত আইন প্রণয়ন, অধিদপ্তর গঠন, প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ এবং কার্যকর পুনর্বাসন কর্মসূচি চালুর আহ্বান জানান।
তিনি বলেন, “আজ যারা স্বজন হারিয়েছেন, তাঁদের অনেকেই বছরের পর বছর অপেক্ষা করেছেন। তাঁদের আর অপেক্ষায় রাখা যাবে না। গুম, খুন, নির্যাতন ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের প্রতিটি ভুক্তভোগী পরিবারকে রাষ্ট্রের দায়িত্বের আওতায় এনে তাদের মর্যাদাপূর্ণ জীবন নিশ্চিত করতে হবে।”
তিনি আশা প্রকাশ করেন, নতুন অধিদপ্তর একটি মানবিক, ন্যায়ভিত্তিক ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পথে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে এবং ভবিষ্যতে কোনো নাগরিককে যেন তাঁর প্রিয়জনের সন্ধানে বছরের পর বছর রাষ্ট্রের দরজায় কড়া নাড়তে না হয়।

বাংলাদেশ জাতীয় মানবাধিকার সমিতির পক্ষ থেকে নতুন অধিদপ্তর গঠনের উদ্যোগকে আন্তরিক অভিনন্দন জানিয়ে মো. মঞ্জুর হোসেন ঈসা বলেন—ভুক্তভোগীদের ন্যায়বিচার, অধিকার, মর্যাদা ও পুনর্বাসন নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত এই উদ্যোগের প্রকৃত সাফল্য আসবে না।

3 thoughts on “গুম-খুনের শিকার পরিবার পুনর্বাসনে আলাদা অধিদপ্তর রাষ্ট্রীয় উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছে বাংলাদেশ জাতীয় মানবাধিকার সমিতি

  1. Switched over from another platform and the welcome package actually pays out on time. The live dealer tables have great streaming quality and the croupiers are super friendly. I love how smooth the mobile navigation feels even on older phones. Drop by q79casino and see for yourself

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *