বগুড়ার তিন আসনে জামায়াতের উত্থান, বিএনপির দুর্গে ভাঙনের সুর

 

জুবায়ের হাসান :

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনৈতিক সমীকরণে বড় ধরনের পরিবর্তনের আভাস মিলছে বগুড়ায়। একসময় বিএনপির অপ্রতিরোধ্য ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত জেলাটির অন্তত তিনটি সংসদীয় আসনে এবার জামায়াতে ইসলামী স্পষ্টভাবে প্রভাবশালী শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। মাঠপর্যায়ের প্রচারণা, জনসম্পৃক্ততা ও ভোটারদের মনোভাব বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, বগুড়া–২, বগুড়া–৩ ও বগুড়া–৪ আসনে জামায়াত এখন জয়ের দৌড়ে এগিয়ে থাকা প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী।

জুলাই গণ–অভ্যুত্থান–পরবর্তী রাজনৈতিক বাস্তবতায় ভোটারদের মধ্যে পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা বেড়েছে। সেই পরিবর্তনের প্রতীক হিসেবে অনেক ভোটারই এবার জামায়াতকে সামনে আনছেন বলে জানিয়েছেন স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও ভোটাররা।

বগুড়া–২ (শিবগঞ্জ):

শিবগঞ্জ উপজেলা নিয়ে গঠিত বগুড়া–২ আসনটি জামায়াতে ইসলামীর জন্য ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৯১ সালে এখান থেকে জামায়াতের সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার নজির রয়েছে। এবারের নির্বাচনে জামায়াত প্রার্থী আবুল আজাদ মোহাম্মদ শাহাদুজ্জামান মাঠে নেমে সেই ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনার প্রত্যয়ে জোরালো প্রচারণা চালাচ্ছেন।

স্থানীয় ভোটারদের মতে, দাঁড়িপাল্লার প্রার্থী এলাকায় নিয়মিত গণসংযোগ, ধর্মীয় ও সামাজিক সংগঠনের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ এবং ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্ন ইমেজের কারণে এগিয়ে রয়েছেন। সম্প্রতি জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমানের শিবগঞ্জ সফর জামায়াতের প্রচারণায় নতুন গতি এনেছে।

একজন প্রবীণ ভোটার বলেন,
“জামায়াত এখানে নতুন কিছু নয়। মানুষ এবার সাহস করে দাঁড়িপাল্লায় ভোট দিতে চায়।”

বগুড়া–৩ (দুপচাঁচিয়া–আদমদীঘি):

দুপচাঁচিয়া ও আদমদীঘি উপজেলা নিয়ে গঠিত বগুড়া–৩ আসনে দীর্ঘদিন বিএনপির প্রভাব থাকলেও এবারের চিত্র ভিন্ন। জামায়াত প্রার্থী নূর মোহাম্মদ আবু তাহের সৎ, শিক্ষিত ও ক্লিন ইমেজের প্রার্থী হিসেবে ভোটারদের আস্থা অর্জনে সক্ষম হয়েছেন বলে স্থানীয়দের মত।

বিশেষ করে জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের পর তরুণ ভোটার ও শিক্ষিত শ্রেণির মধ্যে জামায়াতের প্রতি আগ্রহ বেড়েছে। আদমদীঘির এক স্কুলশিক্ষক বলেন,
“মানুষ এবার ব্যক্তিগত সুনাম আর নৈতিক নেতৃত্ব খুঁজছে। জামায়াত সেই জায়গায় এগিয়ে।”

ভোটের দিন ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে এ আসনে দাঁড়িপাল্লার পক্ষে জনসমর্থন দৃশ্যমানভাবে বাড়ছে বলে দাবি করছেন স্থানীয় রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকেরা।

বগুড়া–৪ (কাহালু–নন্দীগ্রাম):

কাহালু ও নন্দীগ্রাম উপজেলা নিয়ে গঠিত বগুড়া–৪ আসনে জামায়াত ইতিমধ্যে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সাফল্যের নজির স্থাপন করেছে। উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে জামায়াত সমর্থিত প্রার্থীদের জয় এই এলাকায় দলের সাংগঠনিক শক্তিকে আরও দৃঢ় করেছে।

এ আসনে জামায়াত প্রার্থী মোস্তফা ফয়সাল উচ্চশিক্ষিত, সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য এবং দুর্নীতিমুক্ত ভাবমূর্তির কারণে ভোটারদের মধ্যে জনপ্রিয়তা পাচ্ছেন। স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, উন্নয়ন ও নৈতিক রাজনীতির প্রশ্নে জামায়াতের অবস্থান স্পষ্ট হওয়ায় মানুষ এবার দাঁড়িপাল্লার দিকেই ঝুঁকছে।

একজন তরুণ ভোটার বলেন,
“আমরা এবার পরীক্ষা করে দেখতে চাই। পুরোনো রাজনীতি নয়, নতুন ধারা দরকার।”

তিনটি আসনেই জামায়াতে ইসলামী এখন আর প্রান্তিক প্রতিদ্বন্দ্বী নয়; বরং নির্বাচনের নিয়ামক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। বিএনপির দীর্ঘদিনের আধিপত্যে ফাটল ধরার ইঙ্গিত স্পষ্ট।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ভোটার উপস্থিতি স্বাভাবিক হলে এবং শেষ মুহূর্তে কোনো বড় ধরনের অঘটন না ঘটলে বগুড়ার অন্তত কয়েকটি আসনে জামায়াত নতুন ইতিহাস গড়তে পারে।

সব নজর এখন ১২ তারিখের দিকে। বগুড়া কি এবার জামায়াতের উত্থানের সাক্ষী হবে, নাকি পুরোনো রাজনৈতিক সমীকরণই টিকে থাকবে?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *