আবারো বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতার নির্বাচনে ক্ষমতায় যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে আ’লীগ

%e0%a7%a6%e0%a7%af%e0%a7%a6%e0%a7%afএশিয়ানবার্তা: সংলাপে বিশ্বাস করেও এখন তার প্রয়োজন নেই বলে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। তিনি পরিস্কার করে দিয়েছেন, শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ২০১৯ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রস্তুতি নেয়ার কথা। তো আগামী মধ্য ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন কমিশনের মেয়াদ শেষ হয়ে গেলে নতুন নির্বাচন কমিশন গঠনের ব্যাপারে বিএনপিসহ রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে কোনো আলোচনার ইচ্ছা সরকারি দলের নেই। ওবায়দুল কাদের সহ আওয়ামী লীগের একাধিক নেতা আভাস দিয়েছেন, বিষয়টি রাষ্ট্রপ্রতির এখতিয়ার ও তার নির্ধারিত সার্চ কমিটি নতুন নির্বাচন কমিশন গঠন করবে। বিএনপি অবশ্য বলছে নির্বাচন কমিশন গঠনের রুপরেখা দেবে। বিএনপি ছাড়া অন্য কোনো রাজনৈতিক দলের এ নিয়ে কোনো মাথাব্যথা দেখা যাচ্ছে না। যদিও সংবিধান বিশেষজ্ঞ শাহদীন মালিক বিষয়টি রাজনৈতিক সমঝোতার মধ্যে দিয়ে না এগুলে আদালত পর্যন্ত গড়াতে পারে বলে আভাস দিয়েছেন। মোদ্দাকথা নতুন নির্বাচন কমিশন গঠনে রাজনৈতিক কোনো শলা পরামর্শের বিষয়টি অনেকটা বুদবুদের মত বাতাসে মিলিয়ে গেছে বলে মনে হচ্ছে।

তাহলে বিএনপি নতুন নির্বাচন গঠনে রাজনৈতিক আলোচনা বা কোনো শর্ত জুড়ে দিলে এবং সরকারি দল তা না মানলে ফের কি দলটি নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়াবে। প্রহসনের নির্বাচন বা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতার নির্বাচনের গ্যাঁড়াকলে কি আগামী নির্বাচন আটকে যেতে পারে।

এদিকে ওবায়দুল কাদের বলেছেন, হাতে আর বেশি সময় নেই। তাই ফুলের মালা নয়, নেত্রী জনগণের সঙ্গে মেশা পছন্দ করেন। নেত্রীর লক্ষ্য ভিশন-২১। তা বাস্তবায়নে আমাদের কাজ করে যেতে হবে।

এধরনের কথাবার্তায় বিএনপি কি ধরনের সাড়া দেয় তাও কি দেখতে চাচ্ছে সরকারি দল?

দলের নেতাকর্মীদের উদ্দেশে ওবায়দুল কাদের বলেন, দু-একজনের খারাপ আচরণের জন্য শেখ হাসিনার অর্জন ম্লান হতে দেব না। দল ও সরকারের ভাবমূর্তি খারাপ হতে দেব না। তিনি বলেন, রাজনীতিতে হতাশ হবেন না, রাজনীতিতে লেগে থাকেন। একদিন সুফল পাবেন। রাজনীতিতে ধৈর্য আর পরিশ্রমের কোনো বিকল্প নেই। ফুলের মালা নয়, কথা নয়। কাজে নেমে পড়ুন। দয়া করে অপকর্ম বন্ধ করুন, সংশোধিত হোন। যদি না হন কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। আমরা ইতোমধ্যে স্মার্ট আধুনিক টিমওয়ার্ক শুরু করছি। অহেতুক সময় নষ্ট করা যাবে না। তোরণ নির্মাণের দরকার নেই, নেতাদের জন্য ফুলের মালারও দরকার নেই। নেতা আমাদের একজনই, শেখ হাসিনা। আমরা তার হাতেগড়া কর্মী।

তিনি আরো বলেছেন, ছাত্রলীগ নেতাদের বহিষ্কারের মধ্য দিয়ে অ্যাকশন শুরু হয়েছে। যারা শৃঙ্খলাবিরোধী কাজ করবেন, তাদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অপরাধীদের বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও ব্যবস্থা নেবে। অপরাধীর কোনো ছাড় নেই। আর ভালো কাজ করলে শেখ হাসিনা পুরস্কৃত করবেন।

অন্যদিকে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফ বিএনপিকে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, সিপাহী বিপ্লবের নামে মূলত ৩ নভেম্বর জেলহত্যা জায়েজ করার চেষ্টা চালাচ্ছে বিএনপি-জামায়াত। আমরা তাদের এ ষড়যন্ত্র কঠোরভাবে দমন করব। এবার সিপাহী বিপ্লবের নামে কাউকে মাঠে নামতে দেওয়া হবে না।

অর্থাৎ রাজনৈতিক কর্মসূচি বা নির্বাচনী দাবি আদায়ে কোনো রাজনৈতিক দলকে মাঠে নামতে দেয়া হবে না এটা পরিস্কার হয়ে গেল।

এর আগে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ার মহড়া সম্পন্ন হয়েছে। এতে গণতন্ত্র কতটা শক্তিশালী হয়েছে তা রাজনীতির ভবিষ্যত বলে দেবে। আর জাতীয় নির্বাচনে ৩’শ আসনে ১৫৪ টি, অর্ধেকেরও বেশি বিনপ্রতিদ্বন্দ্বিতার নির্বাচন উপহার দিয়েছিল আওয়ামী লীগ। তখন অবশ্য সরকারের শরীকদলগুলোর দুই একটি ক্ষীণ স্বরে প্রতিবাদ করেছিল। কিন্তু তারপর এধরনের বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতার নির্বাচন রাজনীতিতে সংক্রামক ব্যধির মত স্থানীয় পর্যায়ের নির্বাচনেও ছড়িয়ে পড়ে। ২০১৫ সালে অনুষ্ঠিত ঢাকা ও চট্টগ্রাম সিটি নির্বাচন, একই বছর শেষে পৌরসভা নির্বাচনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতার আলামত স্পষ্ট হয়ে ওঠে এবং তা শেষ পর্যন্ত পূর্ণতা পায় ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে।

বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতার এধরনের নির্বাচনে ভোটাররা উৎসবের আমেজ নিয়ে ভোট কেন্দ্রে যাওয়া তো দূরের কথা, নিরাপত্তার আশঙ্কায় ঘর থেকে বের হতে চান না। বিষয়টি পোয়াবারো হয়ে ওঠে তাদের জন্যে যারা নির্বাচনের আগেই ব্যালট পেপারে সিল দিয়ে ভোটের বাক্স ভরে ফেলেন। আইন শৃঙ্খলা বাহিনীকে এব্যাপারে কোনো কাজেই লাগাতে পারেনি নির্বাচন কমিশন। অর্থাৎ অবাধ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের মধ্যে দিয়ে জনগণের মতামত দেয়ার  স্বীকৃত মাধ্যম নির্বাচন হলেও তা গণরায় বলা যাচ্ছে না।

অথচ একটি সামরিক সরকারের অধীনে ১৯৭০ সালে পাকিস্তানে অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনে দেয়া গণরায়ের সাথে জড়িয়ে আছে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্মের সূচনা। ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে দেখা গেছে প্রথম ধাপে ৭৬০টি ইউনিয়ন পরিষদের ৬২টি এবং দ্বিতীয় ধাপে ৬৪৭টির ১৩টিতে আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়ে গেছেন। ভোটের ইতিহাস বলে, মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে ১৯৭১ সালে পাক হানাদারদের ঘোষিত ১২ ও ১৩ ডিসেম্বরের নির্বাচনে, জাতীয় পরিষদের ৭৮টি ও প্রাদেশিক পরিষদের ৭৫টি আসনের ১০০টি ছিল প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন।

পরিসংখ্যান আরো বলে, ১৯৭৩ সালে অনুষ্ঠিত ঘটনাবহুল নির্বাচনে ১১ জন, ১৯৭৯ সালে ১১ জন, ১৯৮৮ সালে ১৮ জন ও ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারির একক নির্বাচনে ৪৯ জন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন। ১৯৮৬ সালে বিএনপি বর্জন করলেও এবং ১৯৯১, জুন ১৯৯৬, ২০০১, ২০০৮ সালের নির্বাচনে কোন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন ছিলেন না। ২০১৪ সালের নির্বাচন সেদিক দিয়ে রেকর্ড গড়েছে। অবশ্য ২০০৭ সালের ২২ জানুয়ারি নির্বাচন হলে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত ১২২ জনকে পাওয়া যেত।

রাজনীতিতে এটা এখন পরিস্কার জাতীয় নির্বাচন যদি একতরফা, একদলীয় হয় তাহলে ক্ষমতাসীনদের অর্ধেকেরও বেশি প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন থাকেন। ভোটারদের অর্ধেকেরও বেশি ভোট কেন্দ্রে না গেলেও কিছু যায় আসে না। এধরনের নির্বাচনের পর সংসদে বিরোধী দলের নতুন ধারা দেখতে পেয়েছে জনগণ। জাতীয় নির্বাচনের পাশাপাশি স্থানীয় সরকার নির্বাচনও একতরফা, একক ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন দেখতে পেয়েছে জনগণ।

অথচ এবার দলীয় ব্যানারে বা রাজনৈতিক দলগুলোর সরাসরি মনোনয়নের সুযোগ থাকলেও ১৭৪টি ইউনিয়নে বিএনপির কোন প্রার্থী ছিল না। বাগেরহাটের মোল্লারহাট ও চিতলমারী উপজেলার ১৩টি ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের প্রার্থীর বিপরীতে কাউকে প্রার্থী হতে দেয়া হয়নি। আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থীরাও মনোনয়ন পত্র দাখিলের সুযোগ পায়নি।

এরপরও নির্বাচন কমিশন বলেছে দু একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছাড়া নির্বাচন সুষ্ঠু হয়েছে। পৌরসভা নির্বাচনেও কমিশনের একই দশা ছিল। মনোনয়ন পত্র জমা দিতে না পারার অজস্র ঘটনা, একের পর এক বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ক্ষমতাসীন প্রার্থীদের নির্বাচিত হওয়া আমলেই নেয়নি নির্বাচন কমিশন। নির্বাচন প্রহসন হলেও নির্বাক স্বাক্ষী হয়ে আছে নির্বাচন কমিশন।

কার্যত নির্বাচন কমিশন দুর্বল নেতৃত্ব, অযোগ্য ব্যবস্থাপনা ও দলীয় মনোভঙ্গির বাসনা পূরণের ক্ষেত্র হয়ে যাওয়ার পর গণআকাঙ্খা প্রতিফলনের পথগুলো নি:শেষ হয়ে গেছে। গণতান্ত্রিক বিকাশ নয় কর্তৃত্ববাদী শাসনকে মহিমান্বিত করাই কি আগামী নির্বাচন কমিশনের একমাত্র দায়িত্ব হয়ে উঠবে?

এদেশেই আশির দশকে সামরিক শাসনামলে স্থানীয় সরকার নির্বাচন চর দখলের আকার ধারণ করলেও নেহাত প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল। ১৯৯১ সালের পরে বড় রাজনৈতিক দলগুলোর পরোক্ষ মনোনয়ন ও সমর্থনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনগুলিতে ফের উৎসবের মেজাজ ফিরে আসে। ভোটারদের বাঁধভাঙ্গা জোয়ার উপচে পড়ে ভোটকেন্দ্রে।

কিন্তু নির্বাচন এখন ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীদের দাপট এবং প্রশাসন-পুলিশের পক্ষপাত দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে। বিরোধী দলীয় প্রার্থী তো দূরের কথা ক্ষমতাসীন দলের বিদ্রোহী প্রার্থীরাও এলাকাছাড়া হয়েছেন। ভোটারদের ভীতি ও ভোট দেবার আগ্রহ কমে গেছে।

এ অবস্থা থেকে বের হবার উপায় কি তা ভোটের ও ভাতের অধিকার আদায়ে লড়াইরত রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে সম্ভবত জানা নেই। কারণ তারাই ইচ্ছা কিংবা অনিচ্ছায় নির্বাচন কমিশনের সায় নিয়ে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতার এক অদ্ভুত নির্বাচনী সংস্কৃতি গড়ে তুলছেন।

২০১৪ সালের নির্বাচনে অর্ধেকেরও বেশি ভোটারের অংশগ্রহণ ছিল না। গত পৌরসভা নির্বাচনে বিরোধী প্রার্থীদের মাঠে নামতে দেয়া হয়নি। এরপর ইউপি নির্বাচনে ৭৯ জন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন। দুই উপজেলার একটি ইউনিয়নও বিরোধী দলীয় প্রার্থী দেখা যায়নি।

রাজনীতির ইতিহাসে জনগণের ভাত ও ভোটের অধিকার প্রতিষ্ঠায় শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ দীর্ঘ লড়াই-সংগ্রাম করেছে। এখন আওয়ামী লীগের নবনির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক নেত্রীর নির্দেশে যে সংসদ নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন তাতে ভোটাররা নির্ভয়ে ভোট কেন্দ্রে যেতে পারবে কি না তা দেখার বিষয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.