অভাব অনটন আর ক্ষুধার যন্ত্রণা থাকলেও চরের মানুষ চর ছাড়ে না

06কাজিপুর (সিরাজগঞ্জ) টি এম কামাল : বর্ষাকাল শেষ। শরতের শুভ্রতাও শেষ। চলছে হেমন্ত। বর্ষ পরিক্রমার ঋতু পরিবর্তন হয়। ঋতু পরিবর্তনের সাথে নদ নদীরও গতিপথ বদলে যায়। পদ্মা, যমুনা, তিস্তা, ব্রহ্মপুত্র আর আগের মত নেই। নদী দেখে মনে হয় না, এইখানে একদিন প্রবল ¯্রােতস্বিনী উত্তাল নদী ছিল। হারিয়ে গেছে ছোট-বড় সহস্্রাধিক নদী। এই নদীর পাড় আর নদীর চরে বাস করে এক কোটিরও বেশি মানুষ। এই এক কোটি মানুষ প্রতিনিয়ত নদীর সাথে লড়াই করছে। লড়াই করছে নদীর নিষ্ঠুর ভাঙ্গনের সাথে। লড়াই করছে অভাবের সাথে। বিশাল পদ্মা, যমুনা, তিস্তা, ধরলা ব্রহ্মপুত্রের চরসহ নদী পাড়ে বসত করা এসব মানুষ নদীর গতি প্রকৃতির সাথে পাল্লা দিয়ে বেঁচে থাকতে চায়। অভাব অনটন, ক্ষুধার যন্ত্রণা থাকলেও চরের মানুষ চর ছাড়তে নারাজ।

নদীর টানেই চরের মানুষ আশায় বুক বেঁধে পড়ে থাকে ভাঙ্গা জীর্ণ কাঁশের ঘরে। বুক ভরা আশা, যে নদী দিনের পর দিন তাদের সর্বস্ব গ্রাস করেছে। সে নদীই একদিন ফিরিয়ে দেবে বাপ দাদার জমি জিরাত। বুক ভরা আশা, যদি হারিয়ে যাওয়া জোত জমি আবার জেগে ওঠে। এই আশা নিয়ে মৌসুমে মৌসুমে নদী আর প্রকৃতির সাথে লড়াই করছে চরের মানুষ। শত দুঃখ যন্ত্রণা নিয়ে অভাব-অনটন নিয়ে চরের মাটিকেই আঁকড়ে ধরে আছে। তাদের মনে বদ্ধমূল ধারণা, ভাঙ্গা গড়াই নদীর খেলা।

নদী পাড়ের চরবাসী মনে করে, জোত জমি গেছে, গেছে ঘরবাড়ী ভিটে মাটি তাতে দুঃখ নেই। রাক্ষুসী নদী সব কেড়ে নিয়েছে। নদীর সাথে তারা যুদ্ধ করছে। নদীতেই তারা মরন চায়। তাদের প্রত্যাশা তবুও নদী বেঁচে থাক। আগের মত উত্তাল হয়ে উঠুক। বর্ষাকালে উত্তাল নদীর ¯্রােতধারার সাথে নদীবক্ষে বয়ে আনবে উর্ব্ব পলি। শুস্ক মৌসুমে জেগে ওঠা সেই নরম পলিতে ফসল ফলাবে।

পদ্মা, যমুনা, তিস্তা, ব্রহ্মপুত্র, ধরলা নদী পাড়ের বগুড়া, রংপুর, গাইবান্ধা, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, নীলফামারী, পাবনা, সিরাজগঞ্জ, রাজশাহী জেলায় ছোট-বড় চার সহ¯্রাধিক চরে প্রায় এক কোটিরও বেশি মানুষের বাস। ঋতু বদলের সাথে নদীর রূপও বদলে যায়। সেই সাথে বদলে য়ায় চরের মানুষের পেশা। তারা কখনও কৃষক, কখনও জেলে, কখনও নৌকার মাঝি, কখনও ঘাটের কুলি। বর্ষাকালে উত্তাল নদীতে নৌকা চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করে। অনেকে শুধু মাছ ধরে। আবার একদিন ছিল যেদিন ঘাটের কুলি মজুরের কাজ করে জীবন কাটিয়েছে। বিশাল পদ্মা, যমুনা, ব্রহ্মপুত্র, তিস্তা, ধরলা নদী এক সময় ¯্রােতধারা হারিয়ে যায়। চরে এসে মানুষ বসতি গড়ে তোলে। জেগে ওঠা এসব চরের বিভিন্ন নামকরণ করা হয়।

চরের নাম ডাকাতমারা, কাউয়াহাগা, চিলমারী, মানুষমারা, চোরমারা, ইন্দুরমারা, ছোনপঁচা, আটারচর, ভাঙ্গারচর, কাওয়াখোলা, মহিষাবান, শিয়ালমারী, বান কি মুন ইত্যাদি। বগুড়ার সারিয়াকান্দি, ধুনট, সোনাতলা, সিরাজগঞ্জের কাজিপুর, সিরাজগঞ্জ সদর, বেলকুচি, চৌহালী, রংপুরের কাউনিয়া, গঙ্গাচড়া, পীরগাছা, গাইবান্ধার ফুলছড়ি, সাঘাটা, সুন্দরগঞ্জ, কুড়িগ্রামের চিলমারী, রৌমারী, রাজিবপুর, নীলফামারীর ডোমার, ডিমলা উপজেলার প্রায় সবটাই চর হিসাবে গণ্য। এসব দুর্গম চরের মানুষ ঋতু পরিবর্তনের সাথে পেশা পরিবর্তন করে জীবিকা নির্বাহ করে।

নদী যখন প্রবল, পানির গতি ছিল তখনই নদীর পাড়ে একদিন গড়ে উঠেছিল ছোট-বড় ৩ শতাধিক নদী বন্দর। কালের বিবর্তনে নদীর গতিপথ হারিয়ে যায়ার সাথে সাথে নদীর পাড়ে গড়ে ওঠা বন্দরও হারিয়ে গেছে। এ সব নদী বন্দরে একদিন ছিল শত শত কুলি মজুরের হাকডাক। কর্মমুখর এ সব নদী বন্দ এখন প্রবীণদের নিকট স্বপ্নের মতে মনে হয়। কত জাহাজ, বার্জ আর বিশাল পালতোলা মহাজনি নৌকা বন্দনে নোঙ্গর করেছে। মালামাল ওঠানামা করেছে। বিখ্যাত সেই নদী বন্দরের মধ্যে চিলমারী, ফুলছড়ি, সারিয়াকান্দি, সিরাজগঞ্জ, নগরবাড়ি, বেড়া, নাকালিয়া নদী বন্দরের এখন আর অস্তিত্ব নেই। নদীর অপ্রতিরোধ ভাঙ্গনে বিলীন হয়ে গেছে। এসব নদী বন্দরে এখন আর জাহাজ ভিড়ে না। ভিড়ে না মহাজনি নৌকা। পাল তোলা নৌকায় স্থান করে নিয়েছে ইঞ্জিন চালিত নৌকা।
চরের প্রায় ৩০ লাখ মানুষ কাজ পেলে পেট ভরে খেতে পায়। কাজ না থাকলে খাবার জোটে না। বর্ষাকালে নৌকা চালিয়ে আর নদীতে মাছ ধরে জীবন চালায়। শুস্ক মৌসুমে জেগে ওঠা নদীর বালির চরে মরিচ, ধান, পাট, চিনা, কাউন, বাদাম, তিল, তিশি চাষ করে। চরের মানুষ জেগে ওঠা চরের জমির অধিকার পায় না। চরবাসী দস্যুরা তাদের লাঠিয়াল বাহিনী নিয়ে জেগে ওঠা চর দখলে নেয়। চরের মানুষ সে জমি বর্গা চাষ করে। লাঠিয়াল বাহিনী তাদের চাষ করা জমির সব ফসল কেটে নিয়ে য়ায়। কাজিপুর উপজেলা চেয়ারম্যান অধ্যক্ষ মোজাম্মেল হক বকুল সরকার, মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান সুলতানা হক ও চরের মনসুর নগর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আব্দুর রাজ্জাক ওরফে রাজমহর জানান, শুস্ক মৌসুমে চর থেকে চরে যাতায়াতের মাধ্যম পায়ে হেঁটে, বাইসাইকেল এবং কোন কোন ক্ষেত্রে চরের বালিতে চলছে ঘোড়ার গাড়ি ও ভ্যান।

চরের মানুষ মরিচ, সবজি, পাট, ধান চাষ করে। তাদের জরিপে আরো জানা যায়, এসব চরের সাথে উপজেলা সদরের কোন ভাল যোগাযোগ ব্যবস্থা নেই। মনসুরনগর থেকে কাজিপুরে সদরে আসতে এক মাত্র সহায় ইঞ্জিন চালিত নৌকা। সকালে একবার মনসুরনগর থেকে ছেড়ে যায়। আবার বিকালে ফিরে আসে।

যাতায়াতে সময় লাগে দুই ঘন্টা। বর্ষ মৌসুমে সময় লাগে একটু কম। প্রতিদিনই এ শ্যালো ইঞ্জিন চালিত নৌকা সার্ভিস চলে। বান কি মুন চর, পীরগাছা, রঘুনাথপুর, চরগিরিশ, রূপসা, খাসরাজবাড়ী, চরছিন্না, নাটুয়ারপাড়া,সানবান্ধা চরের স্থায়ী বাসিন্দা ওমর আলী, আফজাল হোসেন, আব্দুল কাদের, কামরুল, হাসান, কামাল হোসেন, বেলাল হোসেন, নুরুল ইসলাম, আনোয়ার হোসেন, যমুনা নদীর ভাঙ্গা-গড়ার সাথে পাল্লা দিয়ে বেঁচে আছে। নদীর ভাঙ্গনে বসতবাড়ি জমি-জমা হারিয়েও চর ছাড়ে না।

তাদের একটিই কথা, নদীর টানেই তারা পড়ে াকে চর থেকে চরে। নদী যেমন দুঃখ দেয়, কেড়ে নেয় ঘর-বাড়ি, জোতজমি। তেমনি নদীই তাদের সৌভাগ্য বয়ে আনে। ঋতু পরিবর্তনের সাথে তারা পেশা বদল করে। এক সময় জেলে। কোন সময় নৌকার মাঝি। আবার এক সময় কৃষক। সময়ে ঘাটের ঘাটে কুলি-মজুরের কাজ করে। চরবাসির দাবি চরের জেগে ওঠা জমির সুষ্ঠু বন্টন বা ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা অপরিহার্য। চরগ্রাসীদের কবল মুক্ত করা হলে চরের মানুষের দুঃখ থাকবে না। মৌসুমে একটা সময় আসে যখন হাতে কাজ থাকে না। সে সময় চরাঞ্চলে কাজের সুযোগ সৃষ্টি করলে মঙ্গা স্পর্শ করতে পারবে না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.