প্রতিদিনই রোহিঙ্গা আসে বাংলাদেশে

04 এশিয়ানবার্তা: প্রতিদিনই রোহিঙ্গারা ৫জন দশ জন করে রোহিঙ্গা আসে বাংলাদেশে। আর রাখাইনে সমস্যা দেখা দিলে দলে দলে আসে। তবে ১৯৯১ সালের পর এইবার এতোবড় সংখ্যা বাংলাদেশে ঢুকলো। গত একমাসে (‘নো করি লাকের অর্ধেক আইসসে যে’) না হলেও অর্ধলক্ষ রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ করেছে। এরা জেলে নৌকায় করেই পার হয়েছে। আর একটি বড় অংশ মংডু-টেকনাফে নাফ নদী পারাপারের নিয়োজিত  মাঝিদের মাধ্যমে বন্দর দিয়ে প্রবেশ করেছে।

সোমবার টেকনাফের অনিবন্ধিত ক্যাম্প লেদায় আসা এক শরনার্থী আবদুর রহমান জানালেন, মহররমের দিন থেকেই ( গত ৯ অক্টোবর) শুরু হয়েছে অত্যাচার নির্যাতন। একেকটা পাড়া ঘিরে লুটপাট এবং যাওয়ার সময় বলে গেছে, যদি এসে আবার দেখে তাইলে মেরে ফেলবে। সেই থেকেই আসা শুরু।

গত ১৫ অক্টোবর পুরো পরিবার নিয়ে এপারে চলে এসেছেন রহমত খান। তিনি টেকনাফে তার এক আত্মীয়ের বাসায় উঠেছেন বলে জানান। কিন্তু কোনোভাবেই ঠিকানা দিতে রাজি হননি। গত শনিবার তিনি এই প্রতিবেদককে বলেন, নির্যাতনের শিকার হইনি। খবর পেয়েই কয়েকটি পাড়ার লোকজন নগদ টাকা , স্বর্ণ গয়নাসহ কিছু জিনিসপত্র নিয়ে প্যারাবনে লুকিয়ে থাকেন। তারপর ওই পারের নুরুল ইসলাম, গনিসহ দালালদের ধরে জনপ্রতি ৮ হাজার টাকা দিয়ে এপারে চলে আসেন। তিনি কাইট্যাখালি সীমান্ত দিয়ে এসেছেন। তখন বিজিবির টহল  জোরদার ছিলো না। দালালরা সময় বুঝে নৌকায় তুলে দেয় পরিবারগুলোকে এবং একঘন্টার মধ্যে এপারে এসে  নেমে পড়ে রোহিঙ্গারা।

রহমতের মাধ্যমে কথা হয় মংডুর দালাল ও মাঝি নুরুল ইসলামের সঙ্গে। তিনি বলেন, গত ১৫ নভেম্বর পর্যন্ত তার জানামতে ছোটবড় চারশ পরিবার নাফ পাড়ি দিয়েছে। বাংলাদেশ সীমান্তে ঢোকার পর তারা কোথায় গেছে সেটা তিনি জানেন না। তিনি বলেন, যারা এখন যাচ্ছে তারা এক কাপড়ে যাচ্ছে। আগে যারা গিয়েছে তারা টাকা পয়সা নিয়ে যেতে পেরেছেন। শুনেছি অনেকে ঘর ভাড়া করে থাকে। আর মিয়ানমার সীমান্তে থমথমে অবস্থা।

উল্লেখ্য,বিগত ৯অক্টোবর মিয়ানমারে সন্ত্রাসী হামলার জের ধরে দেশটির সেনাবাহিনী এবং বর্ডার গার্ড অব পুলিশের সমন্বয়ে গঠিত ‘অপারেশন ক্লিয়ারেন্স’ নামে পরিচালিত  যৌথ অভিযানে  রোহিঙ্গা পাড়াগুলোতে শুরু হয় নির্বিচারে গুলি-লুট হত্যা ধর্ষন।

শনিবার দুপুরে ১ নম্বর নয়াপাড়া  রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ইনচার্জ ইন্সপেক্টর আবুল কাশেম বলেন,  গোপনে রোহিঙ্গা আসছে। বৈধভাবে ১৯ হাজারের অধিক রোহিঙ্গার হিসাব রয়েছে।

এদিকে অনিবন্ধনকৃত লেদা ক্যাম্পে গিয়ে গতকাল সোমবার জানা গেছে, সেখানে প্রতিদিনই নাফ নদী পাড়ি দিয়ে দালালদের মাধ্যমে  রোহিঙ্গা ঢুকছে। সখানে এতোদিন ধরে প্রায় ৩০ হাজার রোহিঙ্গার থাকার কথা বলা হলেও এখন সেখানেই রয়েছে ৫০ হাজারের বেশি। মিায়ানমারের আরাকান রাজ্যের মংডুর বর্গজিবি গ্রামের রশিদ উল্লাহ (২৫) ১৩ নভেম্বর হেলিকপ্টার থেকে ছোড়া গুলিতে আহত হন। তার ঘাড়, পিঠে ও কোমরে গুলিবিদ্ধ হয়। গুলির সময় তারা ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। এরপর  থেকে তার বোন খুরশিদার হদিস মিলছে না।

এর দুইদিন পর ১৫ নভেম্বর নাফ নদী পাড়ি দিয়ে দালালদের মাধ্যমে তিনি ও তার ভাই এনায়েত উল্লাহ (১৬) এদেশে চলে আসেন  নৌকায় করে। রশিদ জানান, এজন্য এপারে হ্নীলা ইউনিয়নের জাদিমুরা সীমান্তে দালালের হাতে ২০ হাজার টাকা তুলে দেন। তার শরীরের ৩টি গুলিবিদ্ধ হয়েছে। ক্ষত এখনো শুকায়নি। গত শুক্রবার তার মা মরিয়ম খাতুন (৪০), স্ত্রী তৈয়বা (২০), বোন রাশেদা (১৫), মেয়ে সায়েদা (৪) ও ছেলে জুনায়েদ (২)  লেদা ক্যাম্পে আসেন একই পথে।

অন্যদিকে গত মঙ্গলবার ভোরে বরইতুলী সীমান্ত দিয়ে এপারে আসেন মংডুর গ্রামের নুরুন্নাহার (৬০)। তারা লেদা ক্যাম্পে স্বজনদের কাছে আশ্রয় নিয়েছেন। নুরুন্নাহার বলেন, তার পুত্রবধূ মমতাজ,  বোন নূর বাহার, নাতি ইসমত আরা, সাদিয়া, জামাল  হোসেন ও বিয়াই কালা মিয়াও এসেছেন। এজন্য দালালদের জনপ্রতি ৮ হাজার টাকা করে দিতে হয়েছে। নূর বাহার বলেন,  শনিবার সকালে  হেলিকপ্টার  থেকে গুলি  ছোড়া হয়েছে।

জানা গেছে, মংডুর বর্গজীবী গ্রােেমর রশিদ উল্লাহ গুলিবিদ্ধ অবস্থায় পরিবারের আরো ছয় সদস্যকে নিয়ে নাফ নদীর জাদীমুড়া পয়েন্ট দিয়ে  লেদা ক্যাম্পে আশ্রয় নিয়েছেন। এখন তাদের চিকিৎসা দেওয়া হচেছ।

টেকনাফে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ কিছুটা কমতে শুরু করেছে। স্থানীয় প্রশাসন এবং সীমান্তরক্ষী বাহিনীর কড়াকড়ির কারণে বিভিন্ন পয়েন্ট দিয়ে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের হার অনেকটা কমছে বলে স্থানীয়দের অভিমত। গেত সপ্তাহ পর্যন্ত টেকনাফ-উখিয়ার বিভিন্ন সীমান্ত পয়েন্ট ব্যবহার করে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে প্রবেশ করেন। বিজিবির মহাপরিচালক মেজর জেনারলেন আবুল হোসেন টেকনাফ সফরের পর থেকে বিজিবি কর্তৃপক্ষ সীমান্তে তৎপরতা বাড়িয়ে দিয়েছেন। সীমান্ত এলাকাগুলোতে গিয়ে দেখা গেছে, অতিরিক্ত চেকপোষ্টে বিজিবি টহল অব্যহত রয়েছে।

বিজিবির  টেকনাফ ২ ব্যাটালিয়নের উপ-অধিনায়ক মেজর আবু রাসেল সিদ্দিকী বলেন, রোহিঙ্গারা আসতে পারছে না। আর কেউ এসে পড়লে মানবিক সাহায্য দিয়ে তাদের ফেরত পাঠানো হচ্ছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.