রাজশাহীতে একই ঘরে দুই স্কুলছাত্রীর আত্মহত্যা

02রাজশাহী থেকে মঈন উদ্দীন: প্রায় পাশাপাশি দুটি বাড়ি। বলা যায় পা ফেলা দূরুত্ব। দক্ষিণ দিকে সম্পাদের বাড়ি থেকে মাঝে সরু একটি গলি আর কয়েকটি বাড়ি পার হয়েই বন্যাদের বাড়ি। দুজন একই স্কুলে পড়তো। চারঘাটের বেলঘোরিয়া স্কুলের সপ্তম শ্রেণির ছাত্রী ছিল বন্যা ও সম্পা। একসঙ্গেই স্কুলে যাওয়া-আসা থেকে শুরু করে অনেকটা সময় কাটাতো তারা দুই বান্ধবী। আবার একসঙ্গেই গতকাল একই ঘরে পাশাপাশি দুটি বাঁশে ওড়না পেঁচিয়ে আত্মহত্যা করে তারা। তবে পরিবারের দাবি, তাদের য্নৌ হয়রানির কারণেই একসঙ্গে দুই স্কুল ছাত্রী গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়।

এতটুকু বয়সে দুজন স্কুল ছাত্রীর আত্মহত্যার ঘটনার পর থেকে রাজশাহী নগরীর মতিহার থানার শাহপুর গ্রামে বন্যা আর সম্পাদের বাড়িতে চলছে শোকের মাতম। পাশাপাশি সাধারণ মানুষের মাঝেও যেন শোকের ছায়া নেমে এসেছে। বখাটেদের যৌন হয়রানির কারণে দুই কিশোরীর একসঙ্গে আত্মহত্যার ঘটনাটি জানাজানি হওয়ার পর থেকে এ নিয়ে স্থানীয়দের মাঝে ক্ষোভও ছড়িয়ে পড়ছে।

মঙ্গলবার সন্ধ্যার ওই ঘটনার পর থেকে বন্যা আর সম্পাদের বাড়িতে ভীড় জমাচ্ছেন আশে-পাশের লোকজনসহ আম্তীয়-স্বজনরাও। আজ বুধবার সকালেও তাদের বাড়িতে বাড়িতে শোক বিহব্লল মানুষের ঢল নামে।

সরেজমিন ঘুরে জানা গেছে, শাহাপুর পশ্চিপাড়া এলাকার নাজমুল হক নাজুর মেয়ে বর্না (১৩) এবং একই এলাকার মো.মুক্তার আলীর মেয়ে উম্মে মারিয়া সম্পা (১২)। বন্যারা তিন বোন ও এক ভাই। আর সম্পারা এক ভাই এক বোন। দুজনের্ পরিবরাই দরিদ্র। তার পরেও বন্যার বাবার অবস্থা আরো করুন।
দিন এনে দিন খায় অবস্থা তাদের। তবুও ছেলে-মেয়েদের ভবিশ্যত চিন্তা করে শত কষ্ট সহ্য করেও তাদের পড়া-শোনা চালু রাখতে যা যা করার দরকার তাই করেন বন্যার বাবা নাজমুল হক।

03অন্যদিকে সম্পার বাবারও আশা ছিল মেয়ে পড়া-লেখা করে বড় হবে। বাবার দু:খ-কষ্ট ঘুঁচাবে। কিন্তু সেই মেয়ে দুটি গতকাল মঙ্গলবার হঠাৎ করে একই ঘরের দুটি বাঁশের তীরের সঙ্গে গলায় ওড়না পেঁচিয়ে আত্মহত্যা করে বন্যা আর সম্পা। এ নিয়ে পরিবারের সদস্যদের মাঝেও যেমন শোকের ছায়া নেমে এসেছে, তেমনি এলাকাবাসীর মাঝেও শোকের ছায়া নেমে এসেছে।

এদিকে নিহতদের পরিবারের সদস্যরা অভিযোগ করেছেন তারা যৌন হয়রানির শিকার হয়েই আত্মহত্যা করেছে। তাদের লাশ উদ্ধারের সময় ওই দুই ছাত্রীর হাতে দুটি সুইসাইড নোট উদ্ধার করে পুলিশ। এদের মধ্যে সম্পার হাতের সুইসাইড নোটটিতে লিখা ছিল বিপ্লব মাষ্টারের নাম। ওই বিল্পব স্থানীয় কিন্ডার গার্ডেন স্কুলের শিক্ষক। আর বর্নার হাতের নোটে লিখা ছিল মুন্না নামক এক ছেলের নাম। পরিবারের পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে তাদের উত্যক্ত করার কারনে দুজনে আত্মহত্যা করেছে।

নিহত বর্নার বড় বোন নুপুর বলেন, মুন্না নামক একটি ছেলে দীর্ঘদিন ধরে বর্নাকে পথে ঘাটে উত্যক্ত করতো। এর কারণেই শেষ পর্যন্ত আত্মহত্যার পথ বেছে নেয় সে।

অপরদিকে সম্পা খাতুনের মা শরীফা বেগম অশ্রুসিক্ত হয়ে বলেন, আমার মেয়ের আত্মহত্যার পেছনে দায়ীদের বিচার চাই। আমি আর কিচ্ছু চাই না।
পরিবারের লোকজন জানান, স্থানীয় এক কোচিং সেন্টারে তারা কোচিং করে। মঙ্গলবার বিকেলে তারা দুই জনে কোচিং করে। এরপরে বাড়ি ফিরে এসেই তারা শম্পার বাড়িতে এ ঘটনা ঘটায়। এ ঘটনায় এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে।

স্থানীয় সাবেক ওয়ার্ড সদস্য মাসুদ রানা বলেন, এমন দুটি কিশোরী মেয়ে আত্মহত্যার পর থেকেই এলাকার মানুষের মাঝে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। এই ধরনের ঘটনা মেনে নেওয়া যায় না। যারা এই ঘটনার সঙ্গে দায়ী তাদের বিচার হওয়া দরকার।  না হলে সমাজে একের পর এক এই ধরনের ঘটনা ঘটেই চলবে।
আজিজুল ইসলাম নামের আরেক ব্যক্তি বলেন, ‘মেয়ে দুটি এখনো ভাল-মন্দ বুঝাই শেখেনি। অথচ তারা এই বয়সে আত্মহত্যার পথ বেছে নিল। তারপরেও দুজন একসঙ্গে। এটি সত্যিই খুবই কষ্টের বিষয়।

শাহানা খাতুন নামের এক নারী বলেন, বখাটেদের কারণেই মেয়ে দুটি আজ এমন পথ বেছে নিয়েছি। তা না হলে এই বয়সে কেউ আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়?
প্রসঙ্গত, মঙ্গলবার বিকেল চারটার দিকে বন্যা ও সম্পা স্কুল থেকে বাড়ি ফেরে সম্পার ঘরে দুজন একসঙ্গে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করে। আত্মহত্যার সময় বন্যার পরনে স্কুল ড্রেসটিও ছিল। সে স্কুল থেকে বাড়িতেও যায়নি। আত্মহত্যার আগে দুজনেই দুটি সুইসাইড নোট লিখে যায়। তাতে সম্পার হাতে লিখা ছিল বিপ্লব মাস্টার নামেন স্থানীয় বেলঘোরিয়া সানশাইস কিন্ডার গার্টেন স্কুলের শিক্ষক বখাটে বিপ্লব হোসেনের নাম এবং বন্যার হাতের সুইসাইড নোটে লিখা ঝিল বেলঘোরিয়া এলাকার বখাটে ও মাদকসেবী মুন্নার নাম।

এদিকে নগরীর মতিহার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হুময়ান কবির বলেন, দুই বান্ধবী একই ঘরে ওড়না পেঁচিয়ে আত্মহত্যার আগে দুটি সুইসাইড নোট লিখে গেছে। এতে কিছু নাম লিখা আছে। তবে তদন্তের স্বার্থে এখনোই এ নিয়ে কিছু বলা যাবে না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.