সিরাজগঞ্জের অতীত ঐতিহ্য বহনকারী নবরত্ন মন্দির

11সিরাজগঞ্জ থেকে এইচ.এম মোকাদ্দেস: প্রাচীনকাল থেকেই সিরাজগঞ্জের মানুষ ছিল কৃষি নির্ভরশীল । কৃষিকে পুঁজি করেই চলত তাদের জীবন জীবীকা । এদের মধ্যে আবার কিছু মানুষ তাদের গেশাকে পরিবর্তনের  মাধ্যমে তেল ব্যবসায় চলে আসে । পরবর্তীতে তাদের নাম কৃষিজীবীর বদলে তেলজীবী বা কুলু নামে পরিচিতি লাভ করে । সে সময় কাপড় তৈরীর মাধ্যমে যারা জীবীকা নির্বাহ করতো তাদের বলা হতো জোলা । বর্তমানে তাদের সম্প্রদাযের নাম পরিবর্তন করে কারিগর বলে পরিচয় দিয়ে থাকেন। ইংরেজ শাসন আমলে নিসিদ্দ হওয়া তাঁতী কাপড় তৎকালীন সময়ের জোলারা তৈরী করে ঢাকার বিভিন্ন স্থানে বিক্রি করার কারণে তাদের হাতের আঙ্গুল কর্তন করার কারনে অনেকেই পালিয়ে এসে যমুনা নদীর দুই তীরে বসতি গড়ে তোলে ।

মুলত তারাইছিল  বর্তমান সিরাজগঞ্জ,পাবনা,টাঙ্গাইল জেলার কারিগরদের পুর্ব পুরুষ । প্রাচীনকাল থেকে এ তিনটি সম্প্রদায়ের মধ্যে যেমন ছিল ভ্রাতৃত্ব তেমনি দ্বন্দও কম ছিলনা । তাই মাঝে মধ্যে ঘটত নানা অপ্রীতিকর ঘটনা। তিন সম্প্রদায়ের মধ্যে কুলু সম্প্রদায় বসতি গড়েছিল সিরাজগঞ্জের হাটিকুমরুল এলাকায়। ষোড়শ শতকে বসতিগড়ে তারা নিয়মিত বসবাসের মাধ্যমে আধিপত্য বিস্তার করতে স্বক্ষম হয় । তাদের বসতির আদি নিদর্শন এখনও সকলের চোখের দৃষ্টি কারে । যার নাম নবরত- মন্দির । ঠিক কবে নাগাদ ঐমন্দির তৈরী হয়েছিল তার সঠিক ইতিহাস আজও জানা সম্ভব হয়নি ।

তবে বিভিন্ন তথ্য সুত্রে প্রকাশ দিনাজপুরের মথুরার রাজা প্রাণনাথ যখন কান্তজী মন্দির নির্মানের শেষের দিকে এ মন্দির নির্মান করা হতে পারে । কান্দজি মন্দিরের প্রতিষ্ঠাতা প্রাননাথ ছিলেন একজন ভু-স্বামী আর নবরত- মন্দিরের প্রতিষ্ঠাতা রামনাথ ভাদুরী ছিলেন তৎকালীন রাজা সরকারের রাজস্ব আদায় বিভাগের একজন পদস্থ কর্মকর্তা। একবার রাজা প্রাণনাথের বিপুল পরিমানের রাজস্ব বাকী পরায় দেউলে হন রাজা সরকার । বাকীপড়া ওই রাজস্ব আদায়ের দায়িত্ব ভার পান রামনাথ ভাদুরী । প্রাননাত তখন কান্তজির মন্দির নির্মাণে ব্যাস্ত ।

ভাদুরী তখন দিনাজপুরে গিয়ে রাজস্বর টাকার জন্য চাপসৃষ্টি করলে প্রাণনাথ তখন কিছুদিনের সময় প্রার্থনা করেন । বিশেষ বিবেচনায় তখন তাকে সময় দেওয়া হলো আর চুক্তি হলো তিনি এমন একটি মন্দির নির্মানের জন্য খরচের টাকা সহ নির্মান সামগ্রী প্রদান করবেন । চুক্তি অনুযায়ী দিনাজপুরের কান্তজির মন্দির নির্মান শেষে ঐ মিস্ত্রীরাই নকশা অনুযায়ী সাত তলা বিশিষ্ট নবরত- মন্দির নির্মাণ করেন। ভুমিকম্পের কারণে এটির কয়েক তলা মাটির নীচে দেবে যায়। তখন থেকে এ মন্দিরের নামকরণ করা হয় নবরত- মন্দির । কথিত আছে মন্দির নির্মাণের জন্য যেসকল ইট পাথর ব্যবহার করা হয়েছে তা দীর্ঘদিন অক্ষত রাখার জন্য প্রতিদিন ২৫-৩০মণ সরিষার তৈলের মধ্যে ভেজে নেওয়া হতো ।

এতে করে সে সময় তেলের দাম বৃদ্দি পেয়ে পাঁচ পয়সার সরিষার তৈল পাঁচ আনায় ওঠে। আর অধিক লাভের আশায় অনেকেই তখন সরিষা ভেঙ্গে তেল বিক্রির ব্যবসায় নিজেদের আত- নিয়োগ করেন । যা পরবর্তীতে আর তারা নিজেদের অতীত পেশায় ফিরে আসেননি । স্থানীয় সুত্রে জানা যায,মন্দিরটির অতীত সৌন্দর্য্য ছিল অত্যান্ত শৈল্পিক । মন্দিরের গায়ে ছিল অসংখ্য দেব দেবীর মুর্তি আর ফুল পাতার নকশাঁ। আর দেবদেবীদের চোখের মণি তৈরী করা হয়েছিল রুপা দিয়ে ্ কালের পরিবর্তনের সাথে সাথে মন্দিরটির অনেক পরিবর্তন ঘটেছে। ্ খুলে গেছে মন্দিরের গা থেকে অনেক মুল্যবান সম্পদ । ঝড়ে পড়েছে অনেক ইট ।

কিন্তু মন্দিরের নাম শুনে এখনও অনেক পর্যটক প্রতিদিন আসে একনজর মন্দিরটিকে দেখতে । বর্তমানে প্রতœত্তত্ব বিভাগের নিয়ন্ত্রণে মন্দিরটি থাকলেও তেমন কোন পরিবর্তন চোখে পরেনা । মন্দিরের পশ্চিম প্রান্তে অবস্থিত বিশাল পুকুরের চারদিক অরক্ষিত থাকার কারণে মন্দিরের নিরাপত্তা নিয়ে উঠেছে নানা প্রশ্ন । সরকারী ভাবে সম্প্রতি এটির কিছু অংশ সংস্কার করা হলেও তেমন কোন পরিবর্তনের ছোঁয়া লাগেনি। অভিযোগ উঠেছে সংস্কারের নামে প্রায় ৬৫ লাখ সরকারী অর্থ লোপাটের কারণে  মন্দিরটি আজ অ-রক্ষিত অবস্থায় আছে ।

মন্দিরের উত্তর প্রান্তে আছে আরো একটি শীব মন্দির যার সাথায়িত্ব আজও সুরক্সিত আছে । কিন্তু অভাব শুধু তদারকির । সিরাজগঞ্জ রোড নামক গোলচত্বর এলাকা থেকে মাত্র দেড় কিলোমিটার দুরে হাটিকু,রুল গ্রামে অবস্থিত ঐতিহাসিক নবরত- মন্দির। অনেক দুরবর্তী থেকে মানুষ স্বজনদের নিয়ে ঘুরতে আসে এ নবরত- মন্দির দেখতে । সিরাজগঞ্জের অতীত ঐতিহ্য বহন করে চলেছে এ নবরত্ব মন্দির ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.