বগুড়ার শেরপুরে আলু বীজের ভয়াবহ কৃত্রিম সংকট: দিশেহারা কৃষক

001 শেরপুর (বগুড়া) থেকে আব্দুল ওয়াদুদ: পরপর দুবার আলুর বেশ ভাল দাম পাওয়ায় এবার অধিক চাষী আলু চাষের দিকে ঝুকে পড়ছে কৃষকরা। আর এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে এক শ্রেনীর মুনাফাখোর ডিলাররা আলু বীজের কৃত্রিম সংকট দেখিয়ে লক্ষ লক্ষ টাকা হাতিয়ে নেয়ার পায়তারা চালাচ্ছে।

আর এই কারনে বগুড়ার শেরপুরের আলুচাষীরা মারাত্মক বীজ সংকটের মুখে পড়তে পারেন। আলু চাষীদের জমি প্রস্তুত করার আগেই বীজের জন্য বিভিন্ন জায়গায় ধর্না দিতে হচ্ছে কিন্তু কোথাও বীজ না পাওয়ায় হতাশ হয়ে পড়ছেন। কেবলই তারা ‘এ দোকানে ও দোকানে’ হন্যে হয়ে আলু বীজ খুঁজে বেড়াচ্ছেন। আর এ সুযোগে স্থানীয় কতিপয় বীজ ব্যবসায়ীরা টনে টনে বীজ গুদামজাত করে বাজারে কৃত্রিমভাবে ভয়াবহ বীজ সংকট সৃষ্টি করার অপচেষ্টা করেছেন।

মাত্র ১৫ থেকে ২০ জন মুনাফাখোর কালোবাজারী বীজ ব্যবসায়ীর কাছে উপজেলার কয়েক হাজার আলু চাষী জিম্মি হয়ে পড়েছেন। তবে নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি টাকা দিলেই আলুর বীজ মিলছে বলে ভুক্তভোগী কৃষকরা জানিয়েছেন।
সংশ্লিষ্ট সুত্রে জানা যায়, চলতি মৌসুমে এ উপজেলায় ২ হাজার ৫শ’ হেক্টর জমিতে আলু চাষের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে, তবে তা ছাড়িয়ে প্রায় ৩ হাজার হেক্টরে দাঁড়াবে ।

ভুক্তভোগী কৃষকরা জানান, চলতি বছরে শুরু থেকেই আলুর দাম ভাল থাকায় উপজেলার ১০টি ইউনিয়নেই এবার আলু চাষ বেশি হবে। আর কৃষকরা আলু চাষের জন্য আগাম জাতের ধান রোপন করেছিলেন। আর এই সুযোগে ডিলাররা কৃত্তিম বীজ সংকটের পায়তারা করছে। একাধিক কৃষক জানান, আগাম আলু চাষের জন্য তারা জমি প্রস্তুত করে বীজ সংগ্রহের জন্য মাঠে নেমেছেন।

কিন্তু তারা প্রয়োজন মত আলু বীজ পাচ্ছেন না। আবার পেলেও অন্যান্য বছরের চেয়ে অনেক বেশি দামে বীজ কিনতে হচ্ছে। দোকানের গুদামে বীজ দেখা গেলেও বীজ নেই বলে তাদেরকে ফিরিয়ে দেয়া হচ্ছে। আলু চাষী জামাইল গ্রামের আব্দুস সোবহান জানান, ব্রাকের আলু বীজ নেয়ার জন্য ডিলারদের দোকানে দোকানে ঘুরেছি কিন্ত ডিলার জানিয়ে দেন বীজ নেই।

এরপর আমি কৃষি অফিসারের নিকট গেলে তিনি ব্রাকের অফিসারের নিকট ফোন দিয়ে ডিলার ফিরোজ আলম মাষ্টারের নিকট যেতে বলেন এবং একটি শ্লিপ ধরে দেন। পরে আমি সেই ডিলারের নিকট গেলে তিনি সাফ জানিয়ে দেন আলু বীজ নেই। পরে আবারো কৃষি অফিসে গেলে তিনি সেই ডিলারের সাথে কথা বলে আমাকে বীজের ব্যবস্থা করে দেন।

একই অভিযোগ আমইন গ্রামের কৃষক শাহাদত হোসেন, ফজর আলী, আব্দুল আজিজ সহ অনেকের। তারা বলেন এবার ১৬শ টাকা দরের আলু বীজ ২ হাজার থেকে ২৫শ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। তাও সবাইকে বীজ দেয়া হচ্ছেনা।

প্রাপ্ততথ্যে জানা যায়, এ উপজেলায় প্রায় অর্ধশত পাইকারি ও খুচরা বীজ ব্যবসায়ী রয়েছেন। এরমধ্যে ৮ জন ব্রাকের বীজের ডিলার ও ২৫ জন বিএডিসির বীজ ডিলার অনুমোদন প্রাপ্ত। এছাড়া বিভিন্ন কোস্পানির আরো ২৫ থেকে ৩০ জন ডিলার রয়েছেন। তাদের নামে পর্যাপ্ত পরিমান আলু বীজ সরবরাহ করা হলেও তারা কতিপয় মৌসুমী ব্যবসায়ীর কাছে ওইসব বীজ অপেক্ষাকৃত বেশি দামে বিক্রির পায়তারা করছেন।

তারা বিভিন্নস্থানে নিজস্ব বাড়ি ও ভাড়া করা গুদামে ওইসব বীজ গুদামজাত করে রেখেছেন। শেরপুরে ব্রাকের ৮ জন ডিলারের মাঝে ১হাজার ২শ ৪০টন আলু বীজ বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। এরমধ্যে মেসার্স লাবিব ট্রেডার্সের (ফিরোজ আলম মাষ্টার) অনুকুলে ৩শ টন, মেসার্স মিম এন্টারপ্রাইজের অনুকুলে ২শ ৯০টন, মেসার্স এমএসবি এন্টারপ্রাইজের অনুকুলে ৩শ ২০ মেট্রিক টন, মেসার্স রাকিবুল ট্রেডার্সের অনুকুলে ১শ মেট্রিক টন উল্লেখযোগ্য।

খোজ নিয়ে জানা যায় অধিকাংশ আলু বীজ ব্যবসায়ীরা নিজ বাড়ি ও বিভিন্ন গুদাম ঘরে বীজ গুদামজাত করে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরী করার চেস্টা করেছেন। এ ছাড়াও এখনো বেশ কিছু বীজ কোম্পানি থেকে উত্তোলন করা হয়নি। আর এভাবেই তারা বাজারে বীজের কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয়ার পায়তারা করছেন।

ব্রাকের আলু বীজ ডিলার মেসার্স মিম এন্টার প্রাইজ ও এমএসবি এন্টারপ্রাইজের সাথে যোগাযোগ করলে তারা সাফ জানিয়ে দেন কোন আলু বীজ নেই। অপরদিকে কৃষকরা জানান, সবেমাত্র আলু চাষের জন্য জমি প্রন্তুত শুরু হয়েছে অতএব এখনই কোন অবস্থাতেই বীজ ফুরানোর সুযোগ নেই।

ব্রাকের ও বিএডিসির ডিলার আলহাজ্ব মকবুল হোসেন জানান, বীজের কোন সংকট নেই। যদি কোন ডিলার বেশি দামে বিক্রি ও কৃত্তিম সংকটের চেষ্টা করে তার দায় দায়িত্ব তাকেই নিতে হবে।

বিষয়টি নিয়ে কথা বললে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা খাজানুর জানান, বাজারে পর্যাপ্ত বীজের সরবরাহ রয়েছে। তবে কী কারনে বাজারে বীজ সংকট ও দাম বেশি তা তার জানা নেই। স্থানীয় কৃষি অফিস এর কারন অনুসন্ধানে নেমেছে বলে তিনি জানান। তাই কোন বীজ ব্যবসায়ীর ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়া গেলে তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে।

বিএডিসির বগুড়া জেলা বীজ বিপনন বিভাগের উপসহকারি পরিচালক গোলাম সরোয়ার জানান, শেরপুর আমাদের ২৫ জন ডিলারকে ১শ ৩০ টন বীজ দেয়া হয়েছে। প্রয়োজন হলে আরো দেয়া হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.