রাজশাহী নগরীর বিশাক্ত তরল বর্জ্যে নদী পাড়ের মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে চর্মরোগে

01রাজশাহী থেকে মঈন উদ্দনি: রাজশাহী মহানগরীর বিশাক্ত তরল বর্জ্যের প্রতিক্রিয়ায় হুমকীর মুখে পড়েছেন নওহাটার বারনই নদী পাড়ের মানুষগুলো। নদীতে গোসল করে তারা আক্রান্ত হচ্ছেন বিভিন্ন চর্মরোগে।

জানা গেছে, রাজশাহী মহানগরীর তরল বর্জ্য বর্তমানে সিটি পশু হাটের পার্শ্বের ড্রেন দিয়ে দুয়ারী খালে এবং রাজশাহী উন্নয়ন কর্তৃপৰ ভবনের পেছনে পবা গাঙ্গপাড়ার গাঙ্গদিয়ে বায়া বাজারের পাশের খালে ফেলা হচ্ছে। যা পরবর্তীতে নওহাটায় বারনই নদীতে গিয়ে পড়ছে। এই বিষাক্ত পানির মধ্যে রয়েছে শহরের সরকারি-বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিক এর বর্জ্য, বিসিকসহ অন্যান্য মিল-কারখানার কেমিক্যাল বর্জ্য, নগরীর পয়ঃনিষ্কাশনের বিষাক্ত বর্জ্য।

এসব কেমিক্যাল মিশ্রিত বিষাক্ত বর্জ্য পদার্থযুক্ত পানি প্রতিনিয়তই পবা উপজেলার কুজকাই খাল, পাকুড়িয়া, দুয়ারী ক্যানেল, বায়া- মহনন্দখালী খাল হয়ে বারনই নদীতে এসে পড়ছে। রাসিকের বিষাক্ত পানিতে ৰতিতে পড়েছে পবা উপজেলার কয়েকটি নদী-খাল-বিল। নওহাটা পৌরসভা ও বড়গাছি ইউনিয়নের বারনই নদী পাড়ের গ্রামগুলোর মানুষরা নদীতে গোসল করে আক্রান্ত হচ্ছেন ডাইরিয়া, দাদ, চুলকানী, পঁচড়াসহ বিভিন্ন চর্মরোগে। জর্বরি ভিত্তিতে এই বিষাক্ত তরল বর্জ্যের প্রবাহ রোধে যুতসই পদৰেপ নেয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন পরিবেশবিদরা।

নওহাটার বারনই নদীপাড়ের মধুসুদনপুর গ্রামের ইয়াদুল ইসলাম (৫২) জানালেন, বারনই নদী ছাড়া তাদের গোসল করার বিকল্প জায়গা নাই। আগে নদীর পানি ভালো ছিল। এখন কয়েক বছর থেকে নদীর পানিতে শহরের ময়লা পানি এসে পড়ছে। এতে নদীতে গোসল করলে গায়ে চুলকানি বের হচ্ছে। তিনি বলেন, নদীতে গোসল করে তার নিজের, তার মা মরিজান বেওয়া ও মেয়ে লাভলী খাতুনের শরীরে চুলকানি বের হয়েছে। যা সহজে ভালো হচ্ছেনা।

নওহাটার বারনই নদীপাড়ের পূর্ব পুঠিয়াপাড়ার সাইদুর রহমানের স্ত্রী স্বপ্না খাতুন (১৮) ও পশ্চিম পুঠিয়াপাড়ার মিনহাজের স্ত্রী ফরিদা ইয়াসমিন (৩২) জানান, তারা নিয়মিত বারনই নদীতে গোসল করেন। এখন তাদের সর্ব শরীরে চুলকানী বের হয়েছে। মধুসুদনপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায় পঞ্চম শ্রেণির ছাত্রী আসমা খাতুন (১০), ইভা খাতুন (১০), চতুর্থ শ্রেণীর ছাত্র হুমায়ন (৯) এর শরীরে চুলকানি বের হয়েছে। নদীতে গোসল করে তাদের চুলকানি হয়েছে বলে তারা জানায়।

বারনই নদীর ময়লা পানির কারণে নদী পাড়ের যে গ্রামগুলোর মানুষ নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন সে গ্রাম গুলোর মধ্যে রয়েছে নওহাটার বাবুপাড়া, টিকটিকি পাড়া, হলদারপাড়া, দুয়ারী, পুঠিয়াপাড়া, মধুসুদনপুর, আলাই বিদিরপুর, পিলৱাপাড়া, বড়গাছির মথুরা, ইটাঘাটি, আমগাছি। নওহাটা হলদার পাড়ার জেলে সমপ্রদায়ের মন্ডল প্রফুলৱ হলদার জানান, বারনই নদীসহ উন্মুক্ত খালবিলের মাছ মারা আমাদের পৈত্রিক পেশা।

আগে শুধু বর্ষার সময়ে বারনই নদী ও সংযোগ খালে মাছ ধরে গোটা বছরের রোজগার হয়ে যেত। কিন’ কয়েকবছর ধরে শহরের বিষাক্ত পানি নদী-নালা, খাল-বিলে ঢুকে পড়ায় এখন আর মাছ পাওয়া যায় না। সরকারিভাবে মাছের পোনা অবমুক্ত করলেও বিশাক্ত পানির কারনে তা সাথে সাথে মরে যায়। এই বিষাক্ত বর্জ্যর কারণে ভরা মৌসুমেই নদীতে মাছ পাওয়া যাচ্ছে না। এমনকি দুয়ারী ও মহানন্দখালি খালের পানি শরীরে লাগলেও সেখানে ঘা- চুলকানি হয়ে যায়। অথচ ৮/১০ বছর আগে এই খাল ২টিতে ধরা মাছ বিক্রি করে তাদের সংসার চলতো।

বারনই নদী পাড়ের মধুসুদনপুর গ্রামের পলৱী চিকিৎসক জাহিদুল ইসলাম জানান, ৮/১০ বছর যাবত নগরীর তরল বর্জ্য বারনই নদীতে ফেলা হচ্ছে। তখন থেকে নদীতে গোসল করা মানুষ গুলো ডায়রিয়াসহ বিভিন্ন চর্মরোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। আক্রান্ত অনেকেই তার কাছে চিকিৎসা নিতে আসে। খরা মৌসুমে নদীর পানি কমে গেলে এই রোগ বেশি ছড়ায়। তাছাড়া পানিতে গ্যাস হয়ে নদীর মাছ মরে যায়। অসুখের ভয়ে যাদের বিকল্প ব্যবস’া আছে, তারা নদীর পানিতে নামেনা।

মধুসুদনপুর কমিউনিটি ক্লিনিকে গিয়ে কথা হয় সেখানকার সি এইচ সি পি নুর আলমের সাথে। তিনি জানালেন, নদীপাড়ের গ্রাম গুলোর অনেকেই তার ক্লিনিকে ডায়রিয়া, দাদ, চুলকানি, পচড়ার চিকিৎসা নিতে আসে। নদীতে গোসলের কারনে তারা এসব রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন বলে চিকিৎসা নিতে এসে তারা জানায়।

পবা উপজেলার সেনেটারি ইন্সপেক্টর জালাল আহম্মেদ বলেন, নগরীর তরল বর্জ্যের কারণে পবার বায়া ও দুয়ারি ২টি খালসহ বারনই নদীর মাছ মরে যাচ্ছে। এই দুষিত পানির কারণে নদীপাড়ের মানুষজন আক্রান্ত হচ্ছেন ডায়রিয়া- চুলকানিসহ বিভিন্ন অসুখে। এ ব্যাপারে ব্যবস’া গ্রহণের জন্য তিনি বিষয়টি তার উর্ধ্বোতন কর্তৃপৰকে জানিয়েছেন বলে জানান।

হেরিটেজ রাজশাহীর সভাপতি নদী গবেষক মাহবুব সিদ্দিকী বলেন, সিটি কর্পোরেশন নগরীর তরল বর্জ্য পবার যে দুটি খালে ফেলছে সে দুটির মধ্যে বায়া এলাকাটির নাম বারাহী নদী এবং দুয়ারীটির নাম বিলুপ্ত নবগঙ্গা নদী। এই দুটি নদী বেয়ে নগরীর তরল বর্জ্য গিয়ে পড়ছে নওহাটার বারনই নদীতে। এই দুষিত বর্জ্যে মারা যাচ্ছে মাছ, মানুষজন আক্রান্ত হচ্ছেন নানা অসুখে, সেই সাথে নষ্ট হচ্ছে পরিবেশ। পরিবেশের ভারসাম্য রৰায় রাজশাহী সিটি কর্পোরেশন ও ওয়াসার উচিত নগরীর তরল বর্জ্য পরিশোধন করে নদী ৩টিতে ফেলা। তা না হলে আগামীতে আরো বড় সমস্যার সৃষ্টি হতে পারে।

এব্যাপারে ওয়াসা রাজশাহীর সচিব সাদেকুল ইসলাম এর সাথে কথা বললে তিনি বলেন, নগরীর তরল বর্জ্য শোধনের ব্যাপারে প্রকল্প গ্রহণ করে তা সংশিৱষ্ট দফতরে পাঠানো হয়েছে। এটি পাস হলেই বর্জ্য শোধনের প্রয়োজনীয় ব্যবস’- গ্রহণ করা হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.