রাজশাহী টেক্সটাইল মিলে লোকসান ১১১ কোটি

005রাজশাহী থেকে মঈন উদ্দীন: উৎপাদনে যাবার পর থেকেই লোকসানে রাজশাহী টেক্সটাইল মিল। চার দশকে লোকসান গিয়ে ঠেকেছে টাকার অংকে ১১১ কোটিতে। তবে লোকসান কমাতে এখন মিল চলছে ভাড়ায়। ১৯৯৮-১৯৯৯ অর্থ বছরে পরীক্ষামূলক সার্ভিস চার্জ পদ্ধতিতে শুরু হয় এ কার্যক্রম। পরে ২০০৩ সালে থেকে পুরোটাই চলে যায় তাতে। ওই বছরের ৩০ জুন সরকারিভাবে বন্ধ ঘোষণা করা হয় মিল।

এর আগে মিলটির এক হাজার জন স্থায়ী কর্মীকে সরকার ঘোষিত স্বেচ্ছায় অবসরে (গোল্ডেন হ্যান্ডশেক) পাঠানো হয়। ফলে কর্মহীন হয়ে পড়েন কর্মীরা। খরচ বাঁচাতে তখনই বন্ধ করে দেয়া হয় কর্মীদের চিকিৎসাসেবায় চালু হাসপাতালটিও। পরে ২০০৪ সালের আগস্ট আবারো মিল চালু হলে ওই শ্রমিকরা ফিরে আসেন অস্থায়ী ভিত্তিতে দৈনিকভিত্তিক হয়ে। তবে চালু হয়নি সেই হাসপাতালটি।

মিল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ১৯৭৪ সালের ডিসেম্বরে তৎকালীন শিল্পমন্ত্রী শহীদ এএইচএম কামরুজ্জামানের প্রচেষ্টায় ‘রাজশাহী টেক্সটাইল মিলস’ প্রকল্পটি সরকারের অনুমোদন পায়। ১৯৭৫ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি তিনি মিলটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন।
১৯৭৯ সালের ১৩ জানুয়ারী উৎপাদনে যায় রাজশাহী টেক্সটাইল মিল। মূলত: তুলা থেকে সুতা উৎপাদন করে এ মিল।

১৯৭৯-১৯৮০ অর্থবছরে লক্ষ্যমাত্রা ২৫ লাখ কেজির বিপরীতে সুতা উৎপাদন হয়েছিলো ১১ লাখ ১২ হাজার কেজি। ২৫ হাজার টাকু নিয়ে চলমান মিলে সেবছরও লোকসান ছিলো। পরের তিন অর্থবছরেও মোটা অংকের লোকসান হয়।

তবে সব কিছু ছাপিয়ে ১৯৮৩-১৯৮৪ অর্থবছরে সর্বোচ্চ ১৪ লাখ ১৫ হাজার কেজি সুতা উৎপাদন হয়। সেবছরই লক্ষ্যমাত্রা ছিলো ১৯ লাখ ৮৪ হাজার কেজি। ওই অর্থ বছরেই প্রথম লাভের মুখ দেখে রাজশাহী টেক্সটাইল মিল। সেবার লাভ হয়েছে ৫৭ লাখ ৬৩ হাজার টাকা। পরের অর্থ বছরে উৎপাদন কমে গিয়ে দাঁড়ায় ১২ লাখ ৫৪ হাজার কেজিতে। ওই বছরেও লাভ হয়েছে কম, ৬ লাখ ৫৪ হাজার টাকা। এরপর থেকেই পুরো লোকসানে মিল।

নি-নমানের যন্ত্রাংশ হওয়ায় কখনোই যেতে পারেনি পুরোদমে উৎপাদনে। ধীরে ধীরে কমেছে লক্ষ্যমাত্রা ও উৎপাদন। গত অর্থ বছরে ৩ লাখ ৭৫ হাজার কেজির বিপরীতে উৎপাদন ছিলো মাত্র ১ লাখ ৪০ হাজার কেজি। আর চলতি অর্থ বছরে উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৪ লাখ ৯০ হাজার কেজি। এবারো লক্ষ্যমাত্রা পুরণ হবেনা এমনটিই আভাস দিয়েছে মিল কর্তৃপক্ষ।
এদিকে, রাজশাহী টেক্সটাইল মিলের মরার উপর খাড়ার ঘা হয়ে দাঁড়িয়েছে পৌরকর। এ প্রতিষ্ঠানর কাছে রাজশাহী সিটি করপোরেশনের পৌরকর বকেয়া পড়েছে ২ কোটি ৬৯ হাজার ৯৯৬ টাকা।

এর মধ্যে হাল নাগাদ বকেয়া ১২ লাখ ৯৬০ টাকা। এর আগে ২০১৪-১৫ অর্থবছরে বকেয়া ছিলো ১ কোটি ৮৮ লাখ ৬৯ হাজার টাকা। বরাদ্দ পেলে পর্যায় ক্রমে তা পরিশোধের আশ্বাস দিয়েছে মিল কর্তৃপক্ষ।
রাজশাহী টেক্সটাইল মিলের হিসাব শাখার হিসেবে, ২০১৫-২০১৬ অর্থবছর পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটির মোট লোকসান দাঁড়িয়েছে ১১১ কেটি টাকা। এখন প্রতি মাসেই লোকসান অন্তত: ১০ লাখ টাকা। তবে প্রতি ১৮১ দশমিক ৪৪ কেজিতে (৩২ গড়) সার্ভিস চার্জ মিলছে ৭ হাজার ৫৫০ টাকা। সব মিলিয়ে মাসে আয় অন্তত: ৫ লাখ টাকা।

এ টাকার পুরোটাই চলে যায় বিদ্যৎ বিলে। দুই শিফটে এখন কর্মরত ১৬০ জন শ্রমিক। এদের দৈনিক ১২০ টাকা থেকে ১৮০ টাকা পর্যন্ত মজুরী দেয়া হয়। এছাড়া মাস্টাররোল কর্মচারী ও স্থায়ী জনবলতো রয়েছেই। কর্মীদের বেতন এবং মিল রক্ষনাবেক্ষনেই বাড়ছে দেনা।

৩৭ বছর ধরে এ মিলের সিঙ্গেল ফাইবার ফিনিশিং বিভাগে কাজ করছেন জরিনা বেগম। কারখানাতেই কথা হয় তার সঙ্গে। তিনি জানান, সংসারে সচ্ছলতা ফেরাতে মাত্র ১৬ বছর বয়সে কাজে যোগদেন। ওই সময় বেতন পেতেন মাসে ৩ হাজার ৩০০ টাকা। মাঝে মিল বন্ধ হয়ে গেলে তিনিও কাজ হারান। পরে আবারো চালু হলে ফেরেন কর্মস্থলে। এখন দৈনিক ১৪০ টাকা করে মজুরী পাচ্ছেন পঞ্চাশোর্ধ এ নারী।

কথা হয় ওই বিভাগের ফিনিশিং মাস্টার নূরুল ইসলামের সাথেও। তিনি জানান, শ্রমিকদের চেয়ে তার অবস্থা একটু ভালো। মাস্টাররোলে থাকায় তিনি দৈনিক ৪৫০ টাকা করে মজুরী পান। তবে মাস্টারোল কর্মচারীর সংখ্যা সীমিত। শ্রমিকরা অনেকে সল্প মজুরীতেই দিনের পর দিন কাজ করছেন। এদের অধিকাংশই নারী। বিকল্প কাজ না থাকায় বাধ্য হয়ে সস্তায় শ্রম দিচ্ছেন তারা।
তবে এনিয়ে তাদের কিছুই করার নেই বলে জানিয়েছেন মিলের ব্যবস্থাপক কামরুজ্জামান।

তার ভাষ্য, মিল এখন পুরোটাই লোকসানে চলছে। আর তা ঠেকাতেই মিলের আধুনিকায়ন জরুরী। যন্ত্রাপতির যে অবস্থা তাতে মেরামত করেও কাংখিত উৎপাদন সম্ভব নয়। তিনি বলেন, লাভজনক না হোক, লোকসান ঠেকাতে অন্তত: পক্ষে পিপিপির আওতায় দেশী-বিদেশী উদ্যোগে চালু রাখা যেতে পারে মিল। ভাঙ্গাচোরা অবকাঠামোর কারণেও নষ্ট হচ্ছে মূল্যবান যন্ত্রপাতি।

পুরো মিল আধুনিকায়ন করতে অন্তত: ৭০০ কোটি টাকা প্রয়োজন। এটি সম্ভব হলে এখানে অন্তত: এক হাজার শ্রমিকের কর্মসংস্থান হবে অনায়েসেই। বিষয়টি অনেকবার উর্ধতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছেন বলে জানান ব্যবস্থাপক।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.