বিপ্লবী ফিদেল ক্যাস্ত্রোর চিরবিদায়

022এশিয়ানবার্তা: কিউবার সাবেক বিপ্লবী নেতা ফিদেল কাস্ত্রো মারা গেছেন। স্থানীয় সময় শুক্রবার রাতে হাভানায় তিনি মারা যান।
এএফপির খবরে জানানো হয়, কিউবার বর্তমান প্রেসিডেন্ট ও ফিদেল কাস্ত্রোর ভাই রাউল কাস্ত্রো রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে ঘোষণা করেন, স্থানীয় সময় গতকাল রাত ১০টা ২৯ মিনিটে কাস্ত্রো মারা যান। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৯০ বছর।

 

ফিদেল আলেসান্দ্রো কাস্ত্রো রুজ যিনি ফিদেল কাস্ত্রো বা শুধুই কাস্ত্রো নামে পরিচিত। তিনি প্রথম জীবনে একজন জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক নেতা ও পরে সমাজতন্ত্রী বিপ্লবী হিসেবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নাকের ডগায় সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে বিশ্ব জুড়ে নজির স্থাপন করার গৌরব অর্জন করেছেন। ১৯২৬ সালের ১৩ আগস্ট কিউবার পূর্বাঞ্চলে বিরান জেলায় স্পেনীয় বংশোদ্ভূত এক অসচ্ছল অভিবাসী পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছিলেন তিনি

বিংশ শতাব্দির এ মহানায়ক বিশ্বব্যাপী মার্কিন নেতৃত্বাধীন পুঁজিবাদের জয়জয়কারের মধ্যেও সমাজতান্ত্রিক কিউবাকে টিকিয়ে রেখে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের প্রবাদ পুরুষ হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছেন।

বিকল্প পথে বিপ্লবের মাধ্যমে সামরিক স্বৈরশাসকের কাছ থেকে রাষ্ট্রক্ষমতা ছিনিয়ে নেয়ার প্রত্যাশায় ১৯৫৩ সালে একটি সশস্ত্র দল নিয়ে মনকাডা আর্মি ব্যারাকে হামলা করেছিলেন কাস্ত্রো। মনকাডা হামলায় অভিযুক্ত হিসেবে কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে তিনি যে জবানবন্দি দিয়েছিলেন সে জবানবন্দি ছিল তৎকালীন কিউবার রাজনীতির জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। সেই জবানবন্দির মধ্যে কিউবার সামরিক স্বৈরশাসক ও বুর্জোয়া শাসকগোষ্ঠী কর্তৃক সৃষ্ট রাজনৈতিক সংকট এবং সেই সংকট সমাধানের কার্যকরী পথ-নির্দেশনা করেছিলেন তিনি। তার সেই জবানবন্দিমূলক বক্তৃতা ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল গোটা কিউবা জুড়ে। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৫৯ সালে সশস্ত্র বিপ্লবের মধ্য দিয়ে কিউবার মার্কিন সমর্থিত একনায়ক ফুলগেন্সিও বাতিস্তাকে উৎখাত করে যুক্তরাষ্ট্রের নাকের ডগায় একটি সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর থেকেই বিশ শতকের কিংবদন্তিতে পরিণত হয়েছিলেন ফিদেল ক্যাস্ত্রো।

তার পিতা ছিলেন ছোট্ট আখের খামারি। তাই তার শৈশব মোটেও সচ্ছল ছিল না। দরিদ্র শ্রমিকদের স্বার্থ রক্ষায় ছোটবেলা থেকেই কাজ করেছেন কাস্ত্রো। মাত্র ১৩ বছর বয়সে নিজের বাবার আখের খামারে শ্রমিকদের অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে সংগঠিত করে একটি ধর্মঘটের আয়োজন করেছিলেন তিনি।

অসচ্ছলতার মাঝে একটি জেসুইট বোর্ডিং স্কুল থেকে আইনের স্নাতক হিসেবে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা শেষ করেন ক্যাস্ত্রো। লেখাপড়ার পাশাপাশি খেলাধুলায়ও ক্যাস্ত্রো ছিলেন তুখোড়। ১৯৪৪ সালে কিউবার সেরা অলরাউন্ডার স্কুল অ্যাথলেট পুরস্কার প্রাপ্তির গৌরব অর্জন করেন। আইন বিষয়ে ডিগ্রি নেয়ার পরপরই ব্যক্তিগত ও পারিবারিক অসচ্ছলতা দূর করতে হাভানায় একজন আইনজীবী হিসেবে পেশাগত জীবনের সূচনা করেছিলেন ক্যাস্ত্রো। আইন পেশায় দরিদ্র মক্কেলদের পক্ষে লড়ে অল্পদিনের  মধ্যেই ব্যাপক সুনাম ও খ্যাতি অর্জন করেন তিনি।

হাভানা বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিষয়ে পড়ার সময় প্রেসিডেন্ট ফালজেন্সিও বাতিস্তা এবং কিউবার ওপর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক প্রভাবের বিরুদ্ধে জাতীয়তাবাদী সমালোচনা নিবন্ধ লিখে তার রাজনৈতিক জীবন শুরু হয়। একপর্যায়ে ১৯৪৭ সালে নবগঠিত কিউবান পিপলস পার্টিতে যোগ দেন ফিদেল কাস্ত্রো। রাজনীতিতে যোগ দিয়েই তুখোড় বক্তা কাস্ত্রো মার্কিন ব্যবসায়ী শ্রেণি ও সরকারের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, অবিচার, দারিদ্র্য, বেকারত্ব ও মজুরির অভিযোগ নিয়ে লড়াইয়ের আহ্বান জানিয়ে দলের তরুণ সদস্যদের মধ্যে দ্রুত জনপ্রিয়তা লাভ করেন।

১৯৫২ সালে তিনি প্রথমবারের মতো দলীয় কংগ্রেসের সদস্য প্রার্থী হন। নির্বাচনে পিপলস পার্টি যখন বিজয়ের দ্বারপ্রান্তে, ঠিক তখনই জাতীয় নির্বাচনের আগে জেনারেল বাতিস্তা সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে কিউবার ক্ষমতা দখল করেন। ফলে নির্বাচন বাতিল হয়ে যায়।

সামরিক স্বৈরাচারের হাত থেকে জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার সকল গণতান্ত্রিক পথ অবরুদ্ধ হওয়ার ফলে অত্যন্ত বাস্তব কারণে বিকল্প পথে বিপ্লবের মাধ্যমে রাষ্ট্রক্ষমতা অর্জন করার প্রত্যয়ে মাত্র ১২৩ জন নারী, পুরুষের একটি সশস্ত্র দল নিয়ে ১৯৫৩ সালে মনকাডা ব্যারাকে একটি ব্যর্থ আক্রমণ করেন। সংঘর্ষে মাত্র ৮ জন নিহত হয় এবং কাস্ত্রোসহ অন্যরা পরাস্ত হয়ে কারারুদ্ধ হন। মনকাডা আর্মি ব্যারাকে হামলার বিদ্রোহীদের আটক করা মাত্র হত্যা করার নির্দেশ জারি করেন বাতিস্তা।

এই আদেশে ফিদেল কাস্ত্রোর প্রায় ৮০ জন সহযোদ্ধাকে হত্যা করা হলেও কাস্ত্রোকে আটককারী লেফটেন্যান্ট বাতিস্তার নির্দেশ উপেক্ষা করে তাকে বেসামরিক কারাগারে পাঠিয়ে দেন। এতে করে প্রাণে বেঁচে যান তিনি।

পরবর্তীতে কারাগারে তাকে বিষ খাইয়ে হত্যার জন্য বাতিস্তা দায়িত্ব প্রদান করেন ক্যাপ্টেন পেলেতিয়ারকে। কিন্তু পেলেতিয়ার দায়িত্ব পালন করতে অস্বীকৃতি জানিয়ে তা জনসমক্ষে প্রকাশ করে দেন। এই বিরুদ্ধাচারণের জন্য কোর্ট মার্শালে ফাঁসি দেয়া হয় ক্যাপ্টেন পেলেতিয়ারকে। বিশ্ব জনমতের কথা বিবেচনা করে পরে কাস্ত্রোকে হত্যা না করে বিচারের মুখোমুখি করেন বাতিস্তা। মনকাডা হামলার ঐ বিচারে তার ১৫ বছরের কারাদণ্ড হলেও প্রবল জনসমর্থনের কারণে মাত্র দুই বছরের মাথায় তাকে মুক্তি দিতে বাধ্য হন বাতিস্তা সরকার।

১৯৫৫ সালের জুন মাসে রাউল ক্যাস্ত্রোর সাথে নিকো লোপেজের মাধ্যমে চে গুয়েভারার পরিচয় হয় এবং পরে রাউল ক্যাস্ত্রোর মাধ্যমে বিপ্লবী চে-এর সাথে পরিচয় হয় ফিদেল ক্যাস্ত্রোর। চে গুয়েভারা ছিলেন একজন আপাদমস্তক মার্কসবাদী বিপ্লবী। কথিত আছে চে গুয়েভারার সংষ্পর্শে এসেই ফিদেল ক্যাস্ত্রো ক্রমান্বয়ে মার্কসবাদী বিপ্লবী হয়ে ওঠেন। বিখ্যাত টাইম ম্যাগাজিন কিউবা জয়ের তিন বছর পর অত্যন্ত যথার্থভাবেই চে গুয়েভারাকে ক্যাস্ত্রোর মস্তিষ্ক বলে আখ্যায়িত করেছিল।

কিউবা বিপ্লব ও বিপ্লবের পরিকল্পনায় কাস্ত্রোর প্রথম পদক্ষেপ ছিল মেক্সিকো হতে কিউবায় আক্রমণ চালানো। সে লক্ষ্যকে সামনে রেখেই চে গুয়েভারাকে সাথে নিয়েই গেরিলা দল গড়ে তোলার জন্যে মেক্সিকোয় পাড়ি জমান কাস্ত্রো। সেখানে একটি গেরিলা দল গঠন এবং পর্যাপ্ত অস্ত্রশস্ত্র জোগাড়ের পর চে গুয়েভারা, জুয়ান আলমেইডাসহ প্রায় ৮০ জনের একটি বিপ্লবী দল নিয়ে ১৯৫৬ সালে কিউবায় ফিরে আসেন কাস্ত্রো। ১৯৫৩ সালের ২৬ জুলাই মনকাডার সেই হামলার নামানুসারে ফিদেল ক্যাস্ত্রোর নেতৃত্বাধীন গেরিলা দল ‘জুলাই টুয়েন্টি সিক্স মুভমেন্ট’ হিসেবে গোটা কিউবা জুড়ে ব্যাপক পরিচিতি ও জনপ্রিয়তা লাভ করে।

১৯৫৮ সালের মাঝামাঝি বাতিস্তার প্রায় হাজারখানেক সেনা গেরিলাদের হাতে প্রাণ হারালে যুক্তরাষ্ট্র বিমান, বোমা, জাহাজ ও ট্যাংক পাঠিয়ে গেরিলাদের দমানোর চেষ্টা করে। কিন্তু তৎকালীন নাপাম বোমার মতো সর্বাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করেও গেরিলাদের সাথে লড়াইয়ে বাতিস্তা ব্যর্থ হওয়ায় তাকে নির্বাচন দেয়ার পরামর্শ দেয় যুক্তরাষ্ট্র।

১৯৫৮ সালের মার্চে বাতিস্তা কিউবাতে নির্বাচন দিলেও সে দেশের জনগণ ঐ নির্বাচন প্রত্যাখ্যান করেন। কাস্ত্রোর সেনারা চারদিক দিয়ে রাজধানী হাভানাকে ঘিরে ফেলা শুরু করলে ১৯৫৯ সালের পহেলা জানুয়ারি কিউবা ছেড়ে পালিয়ে যান জেনারেল বাতিস্তা।

পরে ৯ জানুয়ারি রাজধানী হাভানায় ঢুকে দেশের নিয়ন্ত্রণভার গ্রহণ বরেন ফিদেল ক্যাস্ত্রোর গেরিলারা। আর এরই মধ্যদিয়ে কিউবার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন ফিদেল ক্যাস্ত্রো। এই আজীবন বিপ্লবী ১৯৬৫ সালে কমিউনিস্ট পার্টি অফ কিউবার সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন এবং কিউবাকে একটি সমাজতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রে রূপান্তরের কাজ শুরু করেন। ১৯৭৬ সালে কিউবার প্রেসিডেন্ট অফ দ্য কাউন্সিল অফ স্টেটস এবং কাউন্সিল অফ দ্য মিনিস্টারস নির্বাচিত হন তিনি। একই সাথে সশস্ত্র বাহিনীর কমান্ডার ইন চিফ হিসেবেও দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

কিউবা-বিপ্লবের পরবর্তী অর্ধশত বছর ধরে পরপর ১০ জন মার্কিন প্রেসিডেন্টের কমরেড ফিদেল কাস্ত্রোকে হত্যা কিংবা উৎখাতের লাগাতার চেষ্টাকে ব্যর্থ করে দিয়ে কিউবার শাসন ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত ছিলেন তিনি। অবশেষে স্বাস্থ্যগত কারণে ৮১ বছর বয়সে স্বেচ্ছায় কিউবার প্রেসিডেন্টের পদ থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়ে ২০০৬ সালের ৩১ জুলাই সাময়িকভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন রাউল কাস্ত্রোর কাছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.