অবহেলিত যাত্রাশিল্পে নবজাগরণ

 

 

 

 

 

jatএশিয়ানর্বাতা: আবহমান বাংলার লোকজ সংস্কৃতির অনন্য উর্বর ও নন্দিত একটি বিনোদন মাধ্যম হচ্ছে ‘যাত্রা’। লোকনাট্যের এ জনপ্রিয় শাখাটি অতি প্রাচীনকাল থেকেই আমাদের গৌরবময় সংস্কৃতির ধারাকে আলোকিত করে রেখেছে। বাংলাদেশের মঞ্চনাটক তথা নাটক, চলচ্চিত্রের আদি উৎস খুঁজতে গেলে যাত্রাকেই পাওয়া যাবে শিকড়ে। মূলত আমাদের সংস্কৃতির অগ্রযাত্রার অন্যতম একটি বাহন হচ্ছে যাত্রাশিল্প।

আমাদের লোকসমাজে যাত্রা এক সময় অসম্ভব জনপ্রিয় ছিল। তখন রাতের পর রাত জেগে মানুষ আপ্লুত হয়ে যাত্রাপালা দেখত। কিন্তু আজ আর যাত্রার সেই জৌলুস নেই। সময়ের পালাবদলে শেকড়ের এ শিল্পমাধ্যম পড়েছে অস্তিত্ব সংকটে।

এমতাবস্থায় দেশব্যাপী যাত্রাশিল্প চর্চার সার্বিক মানোন্নয়নের লক্ষ্যে ‘যাত্রাশিল্প উন্নয়ন নীতিমালা-২০১২’ এর আলোকে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি এ পর্যন্ত দেশের মোট ৮৮টি যাত্রাদলকে নিবন্ধিত করাসহ বেশ কিছু কর্মসূচি গ্রহণ করেছে।

তারই ধারাবাহিকতায় ২৩, ২৪ ও ২৬ নভেম্বর অনুষ্ঠিত হয় ‘৮ম যাত্রা উৎসব ২০১৬’। নিবন্ধনপ্রাপ্তির প্রয়াসে ১৪টি যাত্রাদল এতে অংশ নেয়। এদিকে যাত্রাশিল্পীদের জন্য ২টি বিশেষ কর্মশালা সম্পন্ন করেছে শিল্প-সংস্কৃতির এ অভিভাবক প্রতিষ্ঠান।

প্রথম কর্মশালাটি ছিল যাত্রাদলের নৃত্য শিল্পীদের জন্য নৃত্য প্রশিক্ষণ কার্যক্রম এবং অন্যটি যাত্রাদলের অভিনয়, সঙ্গীতসহ সার্বিক বিষয়ে। ১৮-২৫ নভেম্বর ২০১৬ পর্যন্ত ৮ দিনব্যাপী এ কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয় জাতীয় নাট্যশালার সেমিনার কক্ষে। যার আওতায় নির্মিত হয় ৩০ মিনিটের ৫টি পালা। ২৫ নভেম্বর কর্মশালার সমাপনী দিন বিকাল ৩টায় স্টুডিও থিয়েটার হলে ‘যাত্রাশিল্পে নারী’ শীর্ষক কর্মশালা শীর্ষক সেমিনার শেষে বিকাল ৫টায় মঞ্চায়ন করা হয় কর্মশালাভিত্তিক এ ৫টি পালা। যার মধ্যে মুকুন্দ দাসের ‘কর্মক্ষেত্র’ নির্দেশনা দেন বরেণ্য যাত্রানট মিলন কান্তি দে, সত্য প্রকাশ দত্তের ‘গঙ্গা পুত্র ভীস্ম’ মঞ্চে তোলেন হাবিব সারোয়ার, বজেন্দ্র কুমার দে’র বাঙালি প্রদর্শিত ভিক্টর দানিয়েলের নির্দেশনায়। আসরে পরিবেশিত জিতেন্দ্র বসাকের ‘বাগদত্তা’ নির্মিত হয় কৃষ্ণ চক্রবর্তীর হাতে এবং বজেন্দ্র কুমার দে’র ‘আঁধারে মুসাফির’ নির্দেশনা দেন তাপস সরকার। এ সময় যাত্রাপ্রিয় অগণিত দর্শক-শুভাকাঙ্ক্ষীদের মিলনমেলায় পরিণত হয় স্টুডিও থিয়েটার হল।

শিল্পকলার এ উদ্যোগে যাত্রা সংশ্লিষ্টদের মঝে দেখা দিয়েছে নবউদ্দীপনা। এমনি আশাজাগানিয়া একখ- আলোর ঝলকানিতে আবারও প্রাণের এ শিল্পের পুনর্জাগরণ ঘটাতে সবাই যেন মরিয়া।

যাত্রাপালা শুধু বিনোদনের মাধ্যমই নয়, এর মাধ্যমে দেশপ্রেম, সামাজিক সংস্কার, মুক্তি সংগ্রাম আত্মমর্যাদাবোধ ও অধিকার লাভের দিকনির্দেশনা মিলে। আমাদের লোকসাহিত্য-সংস্কৃতির আদিম নিদর্শন এবং সংস্কৃতির অনন্য তথ্যভান্ডার হিসেবে এ শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখা এখন সময়ের দাবি। যথাযথ উদ্যোগ ও সবার আন্তরিক প্রচেষ্টায় যাত্রাশিল্প তার হারানো গৌরব ফিরে পাবে, এটাই প্রত্যাশা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.