রাতের রাণীর সুভাসে ফুলপ্রেমীরা মুগ্ধ!

ফরমান শেখ,
টাঙ্গাইল প্রতিনিধি:
ফুল ভালোবাসার প্রতীক। প্রিয়তমার গলায় মালা কিংবা খোঁপায় ভালোবেসে ফুল গুঁজে
দেয়ার সৌন্দর্য ও অনুভূতি অনন্য। সব ধরণের শুভ কাজেও ফুলের ব্যবহার রয়েছে। তবে
মানুষভেদে ফুলের পছন্দে তারতম্য দেখা যায়। কেউ কেউ গোলাপ, হাসনা হেনা আবার কেউ
বা গ্রাম-বাংলার মেঠো পথের ধারে ফোটা অজানা ফুলের ভালোবাসায় মুগ্ধ হন। তবে যে
ফুল বছরে একবার ফোটে, সেই ফুল নিয়ে সবার কৌতূহল থাকবে এটাই স্বাভাবিক।
তেমনই একটি ফুল-নাইট কুইন বা ফুলের রাণী।
মিষ্টি মনোহরিণী সুবাস, দুধসাদা রং, স্নিগ্ধ ও পবিত্র পাপড়ি আর সৌভাগ্যের প্রতীক
হিসেবে এই ফুল পরিচিত। রাতের আঁধারে নিজের সৌন্দর্য মেলে ধরে আর সকাল হওয়ার
আগেই ঝরে পড়ে নাইট কুইন। তাই এই একটি ফুলের জন্য বছরের পর বছর অপেক্ষর করতে হয়
ফুলপ্রেমীদের। দেশে দুর্লভ প্রজাতির ফুল হিসেবেই গণ্য করা হয় নাইট কুইনকে।
এমনি একজন টাঙ্গাইলের মধুপুর পৌর শহরের বাসিন্দা ও ফুলপ্রেমী মানিক বসু। সে
ময়মনসিংসের মুক্তাগাছা গাবতলী মহিলা ডিগ্রী কলেজের হিসাব বিজ্ঞানের সহকারী
অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত। তিনি ফুলকে ভালবেসে তার বাসায় ছাদে ও জানালায় টবে
করেছেন ফুল বাগান। এতে অন্যান্য ফুলের গাছ লাগানোর পাশাপাশি নাইট কুইন
ফুলগাছও লাগিয়েছেন তিনি। কয়েক বছর অপেক্ষার পর গত শনিবার (১৩ জুন) রাতে বাসার
ছাদে দুর্লভ এই নাইট কুইন ফুল ফুটেছে।
শিক্ষক মানিক বসু বলেন, ৩০ টি নাইট কুইন লাগিয়ে ছিলাম। তার মধ্যে ৬ থেকে ১০ টি
গাছে সন্ধ্যা থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত নাইট কুইন ফুটেছিল। বাকিগুলোতে কলি এসেছে।
কুইনের সুগন্ধে চারপাশ নান্দনিক পরিবেশ তৈরী হয়। প্রতিবেশি এক নজর দেখার জন্য
বাসায় ভিড় জমিয়েছিল। নাইট কুইন একটি দুর্লভ ফুল। নিজের রুপের বাহার নিয়ে
নাইট কুইন পরিপূর্ণভাবে পাপড়ি মেলে দেয়। অনেকে আবার ফুলটি নিয়ে ছবি তোলায়
ব্যস্ত হয়ে পড়ে।
জানা যায়, নাইট কুইনের বৈজ্ঞানিক নাম পেনিওসিরাস গ্রেজ্জি। বিরল ক্যাকটাস
জাতীয় এ ফুলটির বৈশিষ্ট্য অন্যান্য ফুলের তুলনায় একটু আলাদা। বছরে মাত্র একদিন এবং
মধ্যরাতে পূর্ণ বিকশিত হয়। আর শেষ রাতেই জীবনাবসান ঘটে। পাথরকুচির মতো পাতা
থেকেই এই ফুলগাছের জন্ম হয়। আবার পাতা থেকেই প্রস্ফুটিত হয় ফুলের গুটি। ১৫ দিন পর
গুটি থেকে কলি হয়। যে রাতে ফুলটি ফুটবে, সেদিন বিকেল থেকেই কলি অদ্ভুত সুন্দর
রুপে সাজে। ধীরে ধীরে অন্ধকার যখন চারিদিকে ঘিরে ধরে, ঠিক তখন নিজের সৌন্দর্যে
স্বমহিমায় প্রকাশিত হয় ফুলটি। এর সুবাসে তীব্রতা না থাকলেও অদ্ভুত মিষ্টি
মাদকতা আছে, যা পুষ্পপ্রেমীদের সবসময়ই টানে।
নাইট কুইন নিয়ে নানা গল্প শোনা যায়। সর্বাধিক প্রচলিত গল্প হলো, দুই হাজার বছর
আগে বেথেলহোমে যিশুখ্রিস্টের জন্মের রাতে নগরীর প্রতিটি বাড়িতে নাইট কুইন
ফুটেছিল। এ কারণে একে ‘বেথেলহোম ফ্লাওয়ার’ নামেও ডাকা হয়। তাছাড়া একে
সৌভাগ্যের প্রতীকও বলা হয়। সৌভাগ্য আর গল্প যাই থাকুক অপার সৌন্দর্যই ফুলটিকে
‘রাতের রাণী’ উপাধি দিয়েছে।
সরেজমিনে রবিবার (১৪ জুন) সকালে অধ্যাপক মানিক বসুর বাসায় গিয়ে দেখা যায়, এই
ফুলপ্রেমী বাসার ছাদে প্রায় শতাধিক প্রজাতির ফুল ও ফলের চারা রোপন করেছেন। এতে
অনেক গাছে ইতিমধ্যে ফলও ধরেছে। নাইট কুইন ফুলগাছগুলো বাসার জানালার পাশে টবে
লাগিয়েছেন তিনি। আবার কিছু রুমের ভেতরে রেখেছেন। ফুলের মিষ্টি সুভাসে
চারদিকে মৌ-মৌ ঘ্রাণ ছড়াচ্ছে। এদিকে, এসব ফুলের কলি থেকে মৌ-মাছিরা মধু
আহরণ করছে।
ফুলপ্রেমী মানিক বসু আরো বলেন, নাইট কুইন দেখার জন্য অপেক্ষা করতে হয় মাসের পর
মাস। অন্যভাবে বলতে গেলে অনেক সাধনা করে ফোটাতে হয় নাইট কুইন। কিন্তু তাও
বেশিক্ষণ স্থায়ী হয় না। যে রাতে ফোটে সে রাতেই ঝরে পড়ে। ফুলটি দেখতে যেমন সুন্দর
তেমনি গন্ধও অতুলনীয়। সাদা রঙের ফুলের ভেতর ঘিয়ে রঙের আবরণ ও সুমিষ্ট গন্ধ নাইট
কুইনকে দিয়েছে রাজকীয় মর্যাদা।

ফুল দেখতে আসা সাদিকা হাসান, শিউলী আক্তার, লিপি খাতুন ও ৫ম শ্রেণির ছাত্র মো.
হাসান মাহমুদ বলেন, নাইট কুইন আগে কখনো দেখেনি। বসু স্যারের বাসায় এই
প্রথম দেখলাম। ফুল ফুটতে দেখে আমরা অবাক হয়েছি। নাইট কুইন চারা আমাদের বাসা-
বাড়িতে লাগানোর আগ্রহ বাড়ছে। তারা আরো বলেন, করোনা ভাইরাসের কারণে স্কুল-
কলেজ বন্ধ থাকায় কোথায় ঘুরতে যেতে পারি না। তাই বিকেল হলে স্যারের বাসায় ফুলের
সুভাস নিতে আসি। আর স্যারের অপরুপ এই বাগান দেখতে আসি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.