বাসাবাড়িতে চুরি; নৈপথ্যে শিক্ষাবিমুখ শিশু মাদকসেবীরা

মির্জাপুর (টাঙ্গাইল) থেকে,এম ডি,শামীম:নতুন বছরের প্রথমদিনে স্কুলে স্কুলে যখন সরকারী ভাবে বিনামূল্যে বই বিতরণ হচ্ছিল তখন বস্তা হাতে কিছু শিশু-কিশোরদের দেখা গেছে পলিব্যাগ কিংবা ফেলে দেওয়া কোমল পানির বোতল খুজছে । না… পেটের  তাগিদে না; নিছক নেশার তাগিদে । এমনচিত্র পরিলক্ষিত হয়েছে মির্জাপুর পৌরসভা এলাকার বিভিন্ন স্থানে ।

উপজেলার মির্জাপুর পৌরসভা এলাকার বিশেষকরে ৩,৪ ও ৬ নং ওয়ার্ডসহ বিভিন্ন ওয়ার্ডে ৮-১৫ বছর বয়সী প্রায় শতাধিক শিশু-কিশোর ড্যান্ডি নামক নেশায় আসক্ত হয়ে পড়েছে । ড্যান্ডি মূলত এক জাতীয় সিনথেটিক আঠা যা জুতার আঠা হিসেবে ও ফার্নিচারের জয়েন্ট লাগানোর কাজে ব্যবহৃত হয় । ৭০-২০০ টাকার মুল্যের এই সিনথেটিক আঠা সাধারনত হার্ডওয়্যারের দোকানে পাওয়া যায় ।

ড্যান্ডি আসক্ত এমন কয়েকজন ইয়াছিন (১৫), ইশ^ মিয়া (১৩), হাবীব ( ১০),রাব্বি (১১), ইউসুফ (১২) ও তপন (০৯) দের সাথে কথা বলে জানা যায় খুব অল্প বয়স থেকে ওরা এই নেশা নেওয়া শুরু করে, ওদের কেউ কেউ তৃতীয়-চতুর্থ শ্রেনী পর্যন্ত পড়াশোনাও করেছে কিন্তু  তারপর আর হয়ে উঠেনি। মাদকাসক্ত হাবীব (১০) এর পরিবারের সাথে যোগাযোগ করা হলে তার দাদি  কান্নাজড়িত কন্ঠে জানান- “অনেক চেষ্টা করেও তার নাতিকে তারা ভাল করতে পারছে না, হাবীবের মা-বাবা বেশ কয়েকবার তাকে শাসন করলেও তা সে মানেনি , কয়েকবার স্কুলে- মাদ্রাসায় ভর্তি করিয়ে দিলেও সে পড়াশোনা করতে চায়না, শাসন করলে বাড়ি থেকে বের হয়ে যায় কয়েকদিন আর বাড়িতেই ফিরেনা; খারাপ সংঙ্গে পরে তাদের নাতি নষ্ট হয়ে গেছে।”

অনুসন্ধানে জানা যায় নেশার টাকা জোগাড় করার জন্য এ শিশুদের বেশীরভাগ টোকাইয়ের কাজ করলেও অনেকেই ছোটখাটো চুরি ও জুয়া খেলার মত কাজ করছে । পৌরসভার ৩ নং ওয়ার্ডের হারুন মিয়া,কাওছার মিয়া ও  কয়েকজন বাসিন্দা জানান তাদের বাসা থেকে বেশ কয়েকবার জুতা,কাপড়সহ গৃহস্থলী আসবাবপত্র চুরির ঘটনা ঘটেছে এমনকি মোবাইল সেট চুরির ঘটনাও ঘটেছে কয়েকজনের বাসায় আর এসব ঘটনা টোকাইদের দ্বারাই সংঘটিত হচ্ছে বলে তাদের অভিযোগ । পৌরসভার ৪ নং ওয়ার্ডে দেখা গেছে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত দলবদ্ধভাবে অসংখ্য শিশু-কিশোররা টাকার বিনিময়ে ক্রিকেট বা মার্বেল দিয়ে জুয়া খেলায় মত্ত আছে । ড্যান্ডি আসক্ত জুয়ারী এই শিশুদের অস্বাভাবিক ও উৎশৃঙ্খল আচরনে স্থানীয় বাসিন্দারা অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছে বলে জানিয়েছেন পারভিন আক্তার, বারেক মিয়া, আবুল হোসেন, কাশেম আলী সহ আরও বেশ কিছু ভোক্তভোগী এলাকাবাসী। বারবার ওদের ধাওয়া ও শাসন করেও নিস্তার পাচ্ছেনা এলাকাবাসী। ইতিমধ্যে এলাকার  মীনা রাণী (৩৫) ও জরিনা বেগম(৩২) নামে ২ জন গৃহবধু জুয়া খেলা শিশুদের ক্রিকেট বলের আঘাতে মারাতœক ভাবে আহত হয়ে হসপিটালে চিকিৎসা নিয়েছেন । কিন্তুু অভিযুক্তরা মাদকসেবী ও জুয়ারী শিশু হওয়ায় ভুক্তভোগীরা পুলিশের সহায়তা বা আইনের আশ্রয় নেননি বলে জানান। তাদের অভিযোগ উৎশৃঙ্খল এই সমস্ত শিশুদের জন্য এলাকার পরিবেশ যেমন নষ্ট হচ্ছে, এলাকায় ছোটখাটো চুরির ঘটনা বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং  তাদের সন্তানদের মানুষ করা নিয়েও তারা চিন্তিত।

ভোক্তভোগী ও বিশিষ্টজনদের অভিমত- শুধুমাত্র যে সমস্ত অর্থলোভী ভাংগারী ব্যবসায়ীরা এই সমস্ত শিশুদের অর্থের লোভ দেখিয়ে টোকাইয়ের কাজ করতে প্ররোচিত করে ও যে সমস্ত অসাধু হার্ডওয়্যার ব্যবসায়ীরা জেনে বুঝে শিশুদের কাছে ড্যান্ডি ( সিনথেটিক আঠা) বিক্রয় করে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিলে এবং প্রশাসনিকভাবে পাড়া মহল্লায় সচেতনতামূলক বৈঠকের ব্যবস্থা করে মাদকাসক্তদের শিক্ষামুখী করে তুলার উদ্যোগ নিলে এর থেকে পরিত্রান পাওয়া সম্ভব । নইলে শিক্ষাবিমুখ মাদকাসক্ত এই শিশুরা একদিন সমাজের বোঝা হয়ে দাঁড়াবে, সামাজিক পরিবেশ নষ্ট হয়ে যাবে ।

এ ব্যাপারে মির্জাপুর থানার ওসি (তদন্ত) শ্যামল কুমার দত্ত পিপিএম বলেন- তিনি  ১ মাস হলো তিনি মির্জাপুর থানায় জয়েন করেছেন এর মধ্যে এ ধরনের অভিযোগ তিনি পাননি । তবে এর পুর্বে এ ধরনের  চুরির ঘটনা ঘটে থাকলে ও সে বিষয়ে নির্দিষ্টকরে তথ্য দিয়ে গেলে তিনি বিষয়টি দেখবেন বলে জানান।

পরে এ ব্যাপারে মির্জাপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার ইসরাত সাদমীনের সঙ্গে কথা হলে তিনি বলেন- বিষয়টি সত্যিই স্পর্শকাতর। এ ব্যাপারে খোজ নিয়ে প্রয়োজনীয় সকল ধরনের ব্যবস্থা গ্রহন করা হবে তবে এর থেকে পরিত্রান পাওয়ার জন্য সমাজের সকল শ্রেণীর মানুষের সহযোগিতা ও এগিয়ে আসার আহবান জানান তিনি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.