উত্তরাঞ্চলে ৯০ হাজার কোটি টাকার ৫০ হাজার একর খাসজমি ভূমিদস্যুদের পেটে

এফ শাহজাহান,এশিয়ানবার্তা এক্সক্লুসিভ : ক্ষমতা আর গায়ের জোরে উত্তরাঞ্চলের ৫০ হাজার একর খাসজমি ভূমিদস্যুদের পেটের ভেতরে ঢুকেছে। রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের ১৬ জেলায় প্রায় ৯০ হাজার কোটি টাকার ৫০ হাজার একর খাস জমি ভূমিদস্যুরা দখল করে আছেন বছরের পর বছর ধরে । বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ছত্রছায়ায় বেড়ে ওঠা এসব ভুমিদস্যুদের কাছ থেকে মুল্যবান সরকারী জমি উদ্ধারে আজ পর্যন্ত কোন সরকারই আন্তরিক হয়নি। ফলে যুগ যুগ ধরে এসব জমি ভোগ দখল করে আসছেন প্রভাবশালীরা।

যে জমিগুলো সাধারণত সরাসরি সরকারের মালিকানাধীন থাকে সেগুলো খাস জমি হিসেবে পরিচিত। অর্থাৎ যে জমিগুলো কালেক্টরের নামে রেকর্ড থাকে সেগুলোই খাস জমি।

২০১৪-২০১৫ অর্থবছরে দেশের ৭টি বিভাগে সরকারীভাবে খাসজমি বন্দোবস্তের খতিয়ান অনুযায়ী আরো অনেক খাসজমি বৈধভাবে বরাদ্দ দেয়া হয়নি। এই জমিগুলোই অবৈধ দখলদাররা দখল করে আছে। নিচের ছবিতে ২০১৪-২০১৫ অর্থবছরে দেশের ৭টি বিভাগে সরকারীভাবে খাসজমি বরাদ্দের একটি চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।

 

জেলা প্রশাসক বা ডিসি যখন জমি জমার বিষয়ে কাজ করেন তখন তাকে কালেক্টর বলে। অন্যন্য সংস্থার জমি সরকারের মালিকানায় থাকলে তাকে খাস জমি বলা হয় না। কারণ জমিগুলো যে সংস্থার মালকানায় থাকে সেই সংস্থার জমি বলেই ধরা হয়-যেমন রেলের জমি।

খাস জমির কোনো ভূমি উন্নয়ন কর দিতে হয় না কিন্তু সংস্থার জমির জন্য ভূমি উন্নয়ন করে দিতে হয়।

আইনে বলা আছে, কোনো জমি যদি সরকারের হাতে ন্যস্ত থাকে ও সরকারের নিয়ন্ত্রণাধীন থাকে সেইগুলোই খাস জমি। সরকার এজমিগুলো বন্দোবস্ত দিতে পারেন।

২০১৩-২০১৪ অর্থবছরে দেশের ৭টি বিভাগে সরকারীভাবে খাসজমি বন্দোবস্তের খতিয়ান অনুযায়ী আরো অনেক খাসজমি বৈধভাবে বরাদ্দ দেয়া হয়নি। এই জমিগুলোই অবৈধ দখলদাররা দখল করে আছে। নিচের ছবিতে ২০১৩-২০১৪ অর্থবছরে দেশের ৭টি বিভাগে সরকারীভাবে খাসজমি বরাদ্দের একটি চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।

১৯৫০ সালের স্টেট একুইজিশন এন্ড টেনান্সি এক্টের ৭৬ ধারায় খাস জমির বর্ণনা দেয়া হয়েছে। উক্ত ধারায় বলা হয়েছে যে, কোনো ভূমি যদি সরকারের হাতে ন্যস্ত হয় এবং সেই জমিগুলি যদি সম্পূর্ণ সরকারের নিয়ন্ত্রণাধীন থাকে তাহলে সরকার,এই ভূমিগুলি সরকার কর্তৃক প্রণীত পদ্ধতি অনুযায়ী বন্দোবস্ত দিতে পারেন, অথবা অন্য কোনো ভাবে ব্যবহার করতে পারেন, সরকারের নিয়ন্ত্রণাধীন উপরোক্ত ভূমিগুলিকে খাস জমি হিসাবে বুঝাবে।

খাস ফার্সি শব্দ। এর অর্থ একান্ত আপন বা নিজস্ব বা নিজের।

মুঘল আমলে খালিসা ও জায়গির- এই দুই ধরনের জমি ছিল। মোগল সম্রাট খালিসা জমি নিজেই  নিয়ন্ত্রণে রাখতেন।

এই জমি সম্রাটের ইচ্ছানুযায়ী জায়গির দেয়া হতো। সম্রাটের ব্যক্তিগত খরচ মেটানো জন্য কিছু আলাদা করে রাখা হতে যা সির্ফ-ই-খাস বা একান্ত নিজের হিসেবে বিবেচনা করা হতো। পরবর্তীতে এই খাস জমিগুলো বাংলাদেশ সরকারের অধীনে খাসজমি হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে।

খাস জমি সম্পর্ককে জনসাধারনের যেসব তথ্য জানার অধিকার আছে তা আমরা অনেকেই জানি না। এই না জানার সুযোগে ভুমিদস্যুরা এসব জমি বছরের পর বছর ধরে অবৈধভাবে দখল করে আছে।

খাস জমি লীজ নেয়ার জন্য ১৯৯৫ সালের খাস জমি ব্যবস্থাপনা ও বন্দোবস্ত নীতিমালা এবং ১৯৯৮ সালের ১৫ সেপ্টেম্বরে প্রকাশিত খাস জমি সংক্রান্ত সংশোধিত গেজেট মতে-
কোনো জমি গুলি খাস জমি তা জানার অধিকার।
ভূমিহীন ব্যক্তি হলে খাস জমি বন্দোবস্ত পাবার অধিকার।
ভুলক্রমে কোনো ব্যক্তির জমি খাস জমি হিসেবে গণ্য হলে কিংবা কোন ভূমিহীন ব্যক্তিকে বন্দোবস্ত দিলে তা বাতিল করার অধিকার।
খাস জমি সংক্রান্ত কোন আপত্তি থাকলে আপিলের অধিকার।
ভূমিহীনরা খাস জমি বন্দোবস্ত পাবার জন্য দরখাস্ত দাখিলের জন্য সময় পাবার অধিকার।
জেলা প্রশাসক কর্তৃক খাস জমি বন্দোবস্ত পাবার পর ১ কপি পূনর্বাসন কার্ড পাবার অধিকার।
যদি কোন ভুমিহীন সমিতি থাকে তাহলে ভুমিহীন সমিতির খাস জমি বরাদ্দ পাবার অধিকার।
ভুমিহীন পরিবার কর্তৃক খাস জমির জন্য প্রদত্ত সেলামি/টাকা প্রদানের এবং খাজনা প্রদানের রশিদ পাবার অধিকার।
খাস জমি বন্দোবস্ত পাবার ক্ষেত্রে কবুলিয়ত ফরম/স্বীকৃতি পত্রের এক কপি নিজের কাছে রাখার অধিকার।
জমি দখলে রাখার অধিকার এবং উত্তরাধীকারী গণের নাম পরিবর্তনের অধিকার।
খাস জমি বন্দোবস্ত পাবার পর তা বিনা রেজিস্ট্রেশন ফিতে নিজ নাম রেজিস্ট্রি করে নেয়ার অধিকার ।
খাস জমি বন্দোবস্ত পাবার পর তার সীমানা চিহ্নিত করে রাখার অধিকার।
যদি কোনো ব্যক্তি তার নিজ জমিতে হাস মুরগীর খামার বা দুগ্ধ খামার করে থাকেন তাহলে ঐ ব্যক্তির খামার সংলগ্ন খাস জমি বন্দোবস্ত পাবার অধিকার।
বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে মত্স্য খামার স্থাপনের জন্য সরকারী খাস পুকুর দীর্ঘ মেয়াদের জন্য বন্দোবস্ত পাবার অধিকার।
বাণিজ্যিক ভিত্তিতে ফুলের চাষ, ফলের বাগান এবং রাবার বাগান করার জন্য খাস জমি বন্দোবস্ত পাবার অধিকার।
আইনের লংঘন হিসেবে বিবেচিত হয় যখন কোন জমি গুলি খাস জমি সে বিষয়ে না জানানো। ভুমিহীন ব্যক্তিকে খাস জমি বরাদ্দ না দেওয়া।
ভুলক্রমে কোনো ব্যক্তির জমি খাস জমি হিসেবে গণ্য হলে তা বাতিল করার জন্য সুযোগ না দেওয়া। খাস জমি সংক্রান্ত কোন আপত্তি থাকলে আপিলের সুযোগ না দেওয়া। ভূমিহীনরা খাস জমি বন্দোবস্ত পাবার জন্য দরখাস্ত দাখিলের জন্য সময় না দেওয়া। জেলা প্রশাসক কর্তৃক খাস জমি বন্দোবস্ত পাবার পর ১ কপি পূনর্বাসন কার্ড প্রদান না করা। যদি কোন ভুমিহীন সমিতি থাকে তাহলে ভুমিহীন সমিতিকে খাস জমি বন্দোবস্ত না দেওয়া। ভুমিহীন পরিবার কর্তৃক খাস জমির জন্য প্রদত্ত সেলামি/টাকা প্রদানের এবং খাজনা প্রদানের রশিদ প্রদান না করা
খাস জমি দখলে রাখতে না দেওয়া। খাস জমিতে উত্তরাধীকারী গণের নাম পরিবর্তন করতে না দেওয়া। খাস জমি বন্দোবস্ত পাবার পর তা বিনা রেজিষ্ট্রেশন ফিতে নিজ নাম রেজিষ্ট্রি করে দিতে অস্বীকার করা। খাস জমি বন্দোবস্ত পাবার পর তার সীমানা চিহ্নিত করে রাখাতে না দেওয়া।

এতসব আইন আর নীতিমালা থাকার পরও খাস জমিগুলো যাদের বরাদ্দ পাওয়ার কথা তারা বরাদ্দ পায়নি। উল্টো প্রভাবশালীরা হাজার হাজার কোটি টাকার এই খাসজমি গুলো অবৈধভাবে দখল করে আছে। এর কোন প্রতিকারও করছে না সংশ্লিষ্ট দপ্তর।

এসব খাস জমির বেশিরভাগই শহর বন্দরের আশে পাশে হওয়ায় সেগুলোর বাজার মুল্যও অনেক বেশি। আর সে কারনেই প্রভাবশালীরা এগুলো বৈধভাবে লিজ না নিয়ে জোর করে দখল করে আছেন। কেউ কেউ আবার প্রভাব খাটিয়ে স্বল্প মুল্যে লিজ নিয়ে নিজের নামে রেকর্ডপত্র তৈরী করে মালিক বনে যাচ্ছেন। ভূমি জরিপ ও রেকর্ড অধিদফতর সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

বেদখল হওয়া সরকারী খাস জমিগুলো উদ্ধার করে ভূমিহীনদের মধ্যে বন্দোবস্ত দেয়া হলে লক্ষাধিক ভূমিহীন পরিবারকে পুনর্বাসন করা সম্ভব বলে মনে করছেন এ অঞ্চলের ভুমিহীন সমিতির সদস্যরা। তাছাড়া খাস জমি উদ্ধার করলে এ থেকে প্রতিবছর সরকারের বিপুল পরিমাণ রাজস্ব আয়েরও সুযোগ রয়েছে বলে তারা জানান।

রাজশাহী বিভাগীয় ভূমি জরিপ ও রেকর্ড অধিদফতরের সূত্রটি জানায়, উত্তরের ১৬ জেলায় মোট ৭৫ হাজার ২৪৫ দশমিক ৪১ একর সরকারি খাসজমি রয়েছে। এর মধ্যে বিভিন্ন সময় ৩৫ হাজার একর খাস জমি লিজ দেয়া হয়েছে। বাকি ৪০ হাজার একরেরও বেশি জমি বিভিন্ন সময় অবৈধভাবে দখল হয়েছে। এছাড়াও আরো ২ হাজার একর খাসজমি তদারকির অভাবে বেহাত হতে চলেছে। এসব সম্পত্তি উদ্ধারের কোনো পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে না। ফলে সরকার বিপুল অংকের রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

বগুড়া জেলা ভুমিহীন সমিতির সভাপতি আমীর হোসেন জানিয়েছিলেন,বিপুল পরিমান সরকারী খাস জমি ভূমিহীন ও হতদরিদ্রদের মধ্যে বন্দোবস্ত না দিয়ে নানাভাবে তাদের উচ্ছেদ করা হচ্ছে। এতে করে এ অঞ্চলের লাখ লাখ ভূমিহীন মানুষ তাদের মাথা গোঁজার একমাত্র ঠাঁই পর্যন্ত হারাচ্ছে।

২০১৫-২০১৬ অর্থবছরে দেশের ৭টি বিভাগে সরকারীভাবে খাসজমি বন্দোবস্তের খতিয়ান অনুযায়ী আরো অনেক খাসজমি বৈধভাবে বরাদ্দ দেয়া হয়নি। এই জমিগুলোই অবৈধ দখলদাররা দখল করে আছে। নিচের ছবিতে সরকারীভাবে খাসজমি বরাদ্দের একটি চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।

রাজশাহী বিভাগের ভূমি জরিপ ও রেকর্ড অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, ১৬ জেলায় আরো দেড় হাজার একর ওয়াকফ এবং প্রায় এক হাজার একর দেবোত্তর সম্পত্তি বেহাত হয়ে গেছে। জাল দলিলের মাধ্যমে প্রভাবশালী জোতদার, রাজনৈতিক নেতা ও ভূমি রেকর্ড বিভাগের লোকজন নিজেদের নামে এসব দখল করে নিয়েছেন।

সুত্রটি আরো জানায় রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের ১৬ জেলায় মোট অর্পিত সম্পত্তি আছে ৩ হাজার ৬৭০ একর। এর মধ্যে লিজ দেয়া হয়েছে ২ হাজার ৩১১ একর। বাকি ৩৫৯ একর সম্পত্তি প্রভাবশালীদের দখলে রয়েছে।

দীর্ঘ প্রায় ৩০ বছর ধরে এসব সম্পত্তি বেদখল করলেও সরকারিভাবে উদ্ধারের কোনো পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে না । বরং ভূমি জরিপ ও রেকর্ড বিভাগের একশ্রেণীর অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সহায়তায় জাল দলিল ও ভূয়া রেকর্ডের মাধ্যমে প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতা, জোতদার, শিল্পপতি, হাউজিং এস্টেট ব্যবসায়ী, এনজিও মালিক খোদ ভূমি এবং রাজস্ব দফতরের একশেণীর কর্মকর্তা-কর্মচারী বছরের পর বছর ধরে এসব জমি ভোগদখল করে আছেন।

অনেকেই এসব সরকারি খাসজমি সরকার থেকে স্বল্পকালীন লিজ নিয়ে ভূমিহীন গৃহহীন পরিবারদের উচ্ছদ করে ওইসব জমি নিজেদের দখলে নিয়ে নিচ্ছেন। সরকার আন্তরিক হলে বেদখল হওয়া খাস জমি উদ্ধার করা সম্ভব। এতেকরে একদিকে যেমন বিপুল রাজস্ব আদায় সম্ভব তেমনি এসব খাস জমি ভুমিহীনদের বরাদ্দ দিয়ে দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন অগ্রগতি অর্জন করাও সম্ভব।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.