টাঙ্গাইলে আজ পাক হানাদারমুক্ত দিবস

 

 

 

 

 

 

tangail-hanadarumukto-dibos-pic2-9-12-16টাঈাইল থেকে ফরমান শেখ: ১১ই ডিসেম্বর (রোববার) টাঙ্গাইলে পাক হানাদারমুক্ত দিবস। ১৯৭১ সালের এদিনে বাংলার দামাল ছেলেরা পাক হানাদার বাহিনীর কবল থেকে টাঙ্গাইলকে মুক্ত করে। উত্তোলন করে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা। যুদ্ধকালীন সময়ে টাঙ্গাইলের অকুতোভয় বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সাহসিকতাপূর্ণ যুদ্ধের কাহিনী দেশের সীমানা পেরিয়ে বিদেশেও ছড়িয়ে পড়েছিল। বীর মুক্তিযোদ্ধা বঙ্গবীর আব্দুল কাদের সিদ্দিকীর নেতৃত্বে গঠিত ও পরিচালিত ‘কাদেরিয়া বাহিনীর’ বীরত্বের কথা দেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাসে চিরস্মরণীয়।
কাদেরিয়া বাহিনী দেশের মধ্যাঞ্চল টাঙ্গাইলের সখীপুরের বহেড়াতৈলে অবস্থান করে মহান মুক্তিযুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। ২৬ শে মার্চ থেকে ৩ এপ্রিল পর্যন্ত টাঙ্গাইল ছিল স্বাধীন। এ সময় আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে প্রশাসন পরিচালিত হয়। ২৬ শে মার্চ সকালে আদালত পাড়ার অ্যাডভোকেট নূরুল ইসলামের বাসভবনে এক সভায় গঠিত হয় টাঙ্গাইল জেলা স্বাধীনবাংলা গণমুক্তি পরিষদ।

তৎকালীন আওয়ামী লীগ নেতা আবদুল লতিফ সিদ্দিকীকে আহ্বায়ক ও সশস্ত্র গণবাহিনীর সর্বাধিনায়ক এবং বদিউজ্জামান খানকে চেয়ারম্যান ও আব্দুল কাদের সিদ্দিকীসহ আরো ৮ জনকে সদস্য করে কমিটি গঠিত হয়।
15390885_1331051596925534_5261629579810467718_nটাঙ্গাইলের কৃতি সন্তানদের মধ্যে প্রবাসে মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী, স্বাধীনবাংলা বেতার কেন্দ্রের আব্দুল মান্নান, গণপরিষদ সদস্য শামসুুর রহমান খান শাজাহান ছিলেন অগ্রগণ্য। ক্রমান্বয়ে সংগঠিত হতে থাকে হাজার হাজার মুক্তিযোদ্ধা। গণমুক্তি পরিষদ গঠিত হবার পর চলতে থাকে মুক্তিযুদ্ধের প্রশিক্ষণ। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ৩ এপ্রিল টাঙ্গাইল শহর দখল করে।

টাঙ্গাইল আসার পথে মির্জাপুরের সাটিয়াচরায় হানাদার বাহিনীর সঙ্গে বাঙালি ইপিআর সদস্য ও মুক্তিযোদ্ধাদের যুদ্ধ হয়। এ যুদ্ধে মুক্তিবাহিনী পিছু হটলে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী সেখানে গণহত্যা চালায়। তারা গ্রামে ঢুকে লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ করে। টাঙ্গাইল দখলের পর কালিহাতী ও মধুপুরে মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে পাকবাহিনীর যুদ্ধ হয়। মুক্তিযোদ্ধারা সেখানেও পিছু হটতে বাধ্য হয়।

তারপর মুক্তিযোদ্ধারা নিরাপদ স্থানে চলে যায়। তারা নতুন করে অস্ত্র সংগ্রহ ও সংগঠিত হতে থাকে। আব্দুল কাদের সিদ্দিকীর অসীম সাহস, দুর্বার দেশপ্রেম, পরিস্থিতি বিশ্লেষণে ত্ণী দৃষ্টিভঙ্গি সর্বোপরি মুক্তিযোদ্ধাদের সংগঠিত ও যুদ্ধ পরিচালনায় অসম্ভব মেধার কারণে মহান মুক্তিযুদ্ধে টাঙ্গাইলের ‘কাদেরিয়া বাহিনী’ দেশ-বিদেশে পরিচিতি পায়।
টাঙ্গাইলের প্রতিরোধ যোদ্ধারা ছত্রভঙ্গ হয়ে গেলে পুরো বাহিনী টাঙ্গাইলের প্রত্যন্ত এলাকা সখীপুরের বহেড়াতলীতে চলে যান। সেখানে শুরু হয় এ বাহিনীর পুনর্গঠন প্রক্রিয়া এবং রিক্রুট ও প্রশিক্ষণ। পরবর্তীকালে এ বাহিনীরই নাম হয় ‘কাদেরিয়া বাহিনী’। মুক্তিযুদ্ধকালে আব্দুল কাদের সিদ্দিকী দতা এবং সাহসিকতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন। তার প্রত্য ও পরো নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধারা টাঙ্গাইলে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে সরাসরি অসংখ্য যুদ্ধ ও অ্যাম্বুস করেন।
মুক্তিযুদ্ধের অল্প দিনের মধ্যেই কাদের সিদ্দিকীর নেতৃত্বে গড়ে ওঠে বিশাল কাদেরিয়া বাহিনী। এ বাহিনীর সদস্য ১৭ হাজারে উন্নীত হয়, এছাড়া ১৮ হাজার স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীও কাদেরিয়া বাহিনীর সহযোগী হিসেবে মুক্তিযুদ্ধে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। শুরু হয় বিভিন্ন স্থানে হানাদার বাহিনীর সঙ্গে কাদেরিয়া বাহিনীর যুদ্ধ। এ সময় পাক হানাদারদের কাছে আব্দুল কাদের সিদ্দিকী ‘বাঘা সিদ্দিকী’ নামে এক মহাতঙ্ক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন। এছাড়াও টাঙ্গাইলে খন্দকার আব্দুল বাতেন বাহিনীর নেতৃত্বে গঠিত ‘বাতেন বাহিনী’ অনেক জায়গায় হানাদারদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে। চারদিক থেকে আক্রমণে দিশেহারা হয়ে পড়ে পাক বাহিনী।
১৯৭১ সালের ৮ ডিসেম্বর প্রায় পাঁচ হাজার পাকসেনা এবং সাত হাজার রাজাকার-আলবদর টাঙ্গাইলে অবস্থান করে। খান সেনাদের শক্তি বৃদ্ধির জন্য যমুনা নদী পথে পাঠানো হয় সাতটি জাহাজ ভর্তি অস্ত্র ও গোলাবারুদ। কাদেরিয়া বাহিনী গোপনে এই খবর পেয়ে কমান্ডার হাবিবুর রহমানকে দায়িত্ব দেয় জাহাজ ধ্বংস করার জন্য মাইন পোতার কাজে। জীবন বাজি রেখে ভূঞাপুরের মাটিকাটা নামক স্থানে ঘটানো হয় জাহাজ বিস্ফোরণ। দুটি জাহাজে দুইরাত দুইদিন ধরে চলতে থাকে অনবরত বিস্ফোরণ। বাকি জাহাজগুলো থেকে বিপুল পরিমাণ আধুনিক অস্ত্র উদ্ধার করে নিয়ে যাওয়া হয় জেলার বিভিন্ন স্থানে।
এপ্রিল থেকে ডিসেম্বর ৮ তারিখ পর্যন্ত টাঙ্গাইল, জামালপুর, শেরপুর, কিশোরগঞ্জ, সিলেট, সিরাজগঞ্জ ও পাবনায় বিশাল কাদেরিয়া বাহিনী যুদ্ধে লিপ্ত হয়ে পরাজিত করে খান সেনাদের। এ সব যুদ্ধে ৩ শতাধিক দেশপ্রেমিক অকুতোভয় মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন। মুক্তিযোদ্ধাদের টাঙ্গাইল অঞ্চলের প্রধান বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী যোদ্ধাদের নিয়ে সখিপুরের মহানন্দা ও কীর্ত্তনখোলায় গড়ে তুলেন দুর্ভেদ্য দুর্গ। একের পর এক আক্রমণের মুখে পাক সেনারা গুটিয়ে জেলার অন্যান্য স্থান থেকে এসে যখন টাঙ্গাইল শহরে অবস্থান নেয় তখন উত্তর ও দণি টাঙ্গাইল ছিল সম্পূর্ণ মুক্তিবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে।
৮ ডিসেম্বর পরিকল্পনা করা হয় টাঙ্গাইল আক্রমণের। মিত্র বাহিনীর সঙ্গে সংর্ঘষ হয় পাক সেনাদের পুংলি নামক স্থানে। অবস্থা বেগতিক দেখে প্রাণ ভয়ে পাক সেনারা টাঙ্গাইল ছেড়ে ঢাকার দিকে পালায়। পরিকল্পনা অনুযায়ী চারদিক থেকে সাড়াশি আক্রমণ চালিয়ে পাকসেনাদের টাঙ্গাইল থেকে বিতাড়িত করতে সম হয় কাদেরিয়া বাহিনী।
১০ ডিসেম্বর রাতে টাঙ্গাইল প্রবেশ করেন কমান্ডার আব্দুর রাজ্জাক ভোলা। ১১ ডিসেম্বর সকালে কমান্ডার বায়োজিদ ও খন্দকার আনোয়ার টাঙ্গাইল পৌঁছান। আসেন বিগ্রেডিয়ার ফজলুর রহমান। ১১ ডিসেম্বর ভোরে কাদেরিয়া বাহিনী ও মিত্রবাহিনী যৌথভাবে টাঙ্গাইল সার্কিট হাউজ আক্রমণ করে দখলে নেন এবং শহরকে শত্রুমুক্ত করেন। এরপর তারা ঢাকার উদ্দেশে রওনা দেন।
টাঙ্গাইল শহর সম্পূর্ণ হানাদারমুক্ত হয়। শত শত মানুষ নেমে আসে রাস্তায়। জয় বাংলা-জয় বঙ্গবন্ধু স্লোগানে মুখরিত হয়ে ওঠে টাঙ্গাইল শহর। দিবসটি উদযাপন উপলক্ষে এবার ভিন্ন আয়োজনে বিস্তারিত কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.