কক্সবাজারের উখিয়া সীমান্তে বন ধ্বংস করে মৎস্য চাষের অভিযোগ

07উখিয়া (কক্সবাজার)  থেকে কায়সার হামিদ মানিক: বাংলাদেশ মিয়ানমার সীমান্তের উখিয়ার অজপাড়া গায়ে অর্ধ শতাধিক একরে আবাদি জমি ও সংরক্ষিত বন ভূমি জবর দখল করে মৎস্য চাষ প্রকল্প স্থাপনকে ঘিরে নানা জল্পনা চলছে। সাবেক শিবির নেতা, জামাতের মাওলানা সিরাজুল ইসলাম ও চট্টগ্রামের কতিপয় অজ্ঞাত ব্যক্তিদের অর্থায়নে বন বিভাগের রিজার্ভ পাহাড় টিলা ভূমি খাদে বাঁধ দিয়ে, বন ভূমির শ্রেণি পরিবর্তন ঘটিয়ে, স্কুল শিশু ও সাধারনের চলাচলের রাস্তা জবর দখল করে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি করা হয়েছে।

এতে প্রকৃতি, বন ও পরিবেশ ধ্বংস করে মৎস্য চাষ প্রকল্পের কাছ চালানো হচ্ছে। স্থানীয় দরিদ্র লোকজনদের টাকার লোভে ফেলে কৌশলে তাদের সামান্য আবাদি জমি জিরাত ১০ বছরের চুক্তির শর্ত লংঘন করে ঘের নির্মান করায় জমির মালিকদের মাঝে ক্ষোভ ও উৎকন্ঠা দেখা দিয়েছে। উক্ত ঘের নির্মানে পরিবেশ, বন ও মৎস্য অধিদপ্তরের কোন অনুমোদন নিয়েছে বলে জানা যায়নি।

সরজমিনে দেখা গেছে, কক্সবাজার দক্ষিণ বন বিভাগের উখিয়া বন রেঞ্জের উখিয়া সদর বন বিটের রিজার্ভ বন ভূমি বেষ্টিত পাহাড় টিলার খাদে খাদে বাঁধ দিয়ে মৎস্য চাষ প্রকল্প চালু করা হয়েছে। বনভূমি বেষ্টিত আশ পাশের স্থানীয় লোকজনের সাথে কৌশলে ভাব জমিয়ে তাদের যৎসামান্য চাষাবাদের জমি রয়েছে সে গুলো ১০বছরের জন্য লিখিত চুক্তিবদ্ধতার মাধ্যমে চট্টগ্রামের মাওলানা সিরাজুল ইসলাম দখলে নিয়েছে।

গত মাস অধিক কাল ধরে পরিবেশ ও বন সহ যাবতীয় আইন কানুনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে বোল্ড ড্রেজার দিয়ে পাহাড়ি টিলা সাবাড় করে মৎস্য ঘেরের বাঁধ ও যাতায়াতের রাস্তা নির্মান কাজ চালানো হচ্ছে। উখিয়া রাজাপালং ইউনিয়নের হাতি মুড়া ও দক্ষিণ দরগাহ বিল এলাকার গহীন বনাঞ্চল ঘেরা এ এলাকায় অর্ধ শতাধিক একরের মত জোত জমির একাংশে ও সংলগ্ন বিপুল পরিমানের সংরক্ষিত বন ভূমির শ্রেণি পরিবর্তন ঘঠিয়ে মৎস্য ঘের করা হচ্ছে এবং তা প্রতিনিয়ত সম্প্রসারিত করা হচ্ছে।

২ বছর পূর্বে রাজাপালং ইউনিয়ন পরিষদ থেকে হাতি মুড়া হতে পার্বত্য নাইক্ষংছড়ির মিয়ানমার সংলগ্ন আজু খাইয়া গ্রাম পর্যন্ত সংযোগ সড়ক নির্মান করায় সেখানকার কয়েক গ্রামের অসংখ্য লোক জনের যাতায়াত সুবিধা ঘটে। কিন্তু জামাত নেতা ঐ জন চলাচলের রাস্তাটি জবর দখল করে মৎস্য ঘের করায় সে সড়কটি পানিতে তলিয়ে যায়। এতে আশ পাশের ৩/৪টি গ্রামের কয়েকশ পরিবার সহজে যাতায়াত সুবিধা বঞ্চিত হয়ে পড়েছে। ঐ সব গ্রামের স্কুলগামী শিশুরা বিদ্যালয়ে যেতে পারছে না বলে শিক্ষক ও অভিভাবকদের অভিযোগ। অসুস্থ রোগী বৃদ্ধ লোক ও মহিলাদের অনেক দুর ঘুরে হাসপাতল সহ হাট বাজারে যাতায়াত করতে হচ্ছে।

উখিয়া রাজাপালং ইউনিয়নের হাতি মুড়া গ্রামের মৃত নজির আহাম্মদের ছেলে জামাত নেতা মৌলনা সিরাজুল ইসলাম দীর্ঘদিন ধরে চট্টগ্রামে অবস্থানের সুবাধে জামাতের একজন বড় মাপের গোপন অর্থ দাতা বলে একাধিক সূত্রে জানা গেছে। যেখানে তিনি কয়েক কোটি টাকার মৎস্য চাষ প্রকল্প গড়ে তুলছে সেখান থেকে মিয়ানমারের দুরত্ব প্রায় ১ থেকে দেড় কি:মি:। মৎস্য চাষ প্রকল্পে কিছু দুরে বিজিবির একটি সীমান্ত চৌকি রয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক গ্রামবাসীর মতে যারা মৎস্য ঘের বানাচ্ছে তাদের ভূমিকা এলাকায় রহস্যাবৃত। তারা বিভিন্ন সময় সরকার বিরোধী কার্যকলাপে সাথে সংশ্লিষ্ট।

তাছাড়া রোহিঙ্গা বিচ্ছিন্নতাবাদি সংগঠন আরএসও এর সাথে ঘের মালিক পক্ষের সাথে দীর্ঘদিনের সম্পর্ক থাকায় সীমান্ত সংলগ্ন পাহাড়ি এলাকায় মৎস্য ঘের নির্মান রহস্য ঘনীভূত হচ্ছে বলে এলাকাবাসির অভিযোগ। এখানে রাতে অন্ধকারে বিলাস বহুল গাড়ি নিয়ে অজ্ঞাত অচেনা লোকজনের সমাগমও ঘটে বলে জানা গেছে।

স্থানীয় হাতি মুড়া সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রধান শিক্ষক আনোয়ারুল ইসলাম চৌধুরী ক্ষোভের সাথে জানান প্রায় এক বছর ধরে পূর্ব দরগাহ বিল, বাগান মুড়া, আজু খাইয়া, দক্ষিণ হাতি মুড়ার অনেক শিশু নিয়মিত স্কুলে আসতে পাচ্ছে না। কারন জনচলাচলের রাস্তা, পথ, আইল সব কিছু মৎস্য ঘেরের ভেতর দখলে নেওয়ায় সর্বত্র জলাবদ্ধতার সৃষ্টির ফলে শিশুরা ভয়ে স্কুলে আসতে পারছে না। মৎস্য ঘের এলাকায় জমির মালিক মৌলভী কবির আহমদ জানান প্রতি সনে নবায়নের শর্তে স্থানীয় লোকজনের সাথে ১০ বছরের চুক্তিতে মৌলভী সিরাজকে জমি দেওয়া হয়। শর্তে আবাদি ধানি জমি কোন রূপ শ্রেণি পরিবর্তন না করা সহ নানা কথা থাকলেও ঘের মালিক তা মানছে না।

তিনি বলেন আমি আট কানি জোত জমি তার সাথে চুক্তিবদ্ধ করেছি। চুক্তি বাইরে আমার দখলী বিভিন্ন ফলজ, বনজ বাগানের পাহাড়, টিলা বোল্ড ড্রেজার দিয়ে বেআইনি ভাবে কেটে উজাড় করে ফেলছে। এতে আমার বাগানের আম, কাঠাল, আকাশ মনি সহ অন্ততঃ তিন শতাধিক গাছ কেটে ফেলেছে। বার বার ও গাছ না কাটতে নিষেধ করার পরও সে কিছুই মানছে না। জমির অপর মালিক বসির আহাম্মদ বলেন, আমরা জমির মালিকরা ঐ জামাতের ক্যাডারের মিষ্টি কথায় কৌশলে না বুঝে ভূল করেছি। সে শর্ত লংঘন করে আমাদের আবাদি ধানি জমি ভরাট করে বাঁধ, রাস্তা নির্মান করছে, জমির মাটি কেটে উর্বরতা শক্তি নষ্ট করছে। তাকে বারন করার পরও সে থামছে না।

স্থানীয় অপর জমির মালিক সুলতান আহাম্মদ, নুরুল আলম, বিধবা সামারুপ বেগম সহ অনেকে বলেন মৌলভী সিরাজুল এর সাথে আমাদের যে চুক্তিপত্র তা সে প্রতি নিয়ত লংঘন করে যাচ্ছে। মৎস্য ঘের হলে এলাকার লোকজনের কর্ম সংস্থান ও উন্নয়ন হবে ভেবে আমরা তাকে জমি দিয়ে সহযোগীতা করি। কিন্তু আমাদের একমাত্র সম্বল জমি টুকুর যে হাল সে করছে, পাশ্ববর্তী পাহাড় টিলা কেটে সাবার করছে তাতে আমরা খূবই চিন্তিত ও উদ্বিগ্ন। রাজাপালং ইউপি চেয়ারম্যান জাহাঙ্গীর কবির চৌধুরী বলেন, মৎস্য ঘের এলাকায় লোকজনের যাতায়াতের জন্য একটি রাস্তা, কালভার্ট নির্মান করা হয়েছিল। জানতে পেরেছি ঘের মালিক পক্ষ সেটি জবর দখল করে ঘের বানিয়েছে এবং জনচলাচলের দুর্ভোগ সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয় অনেক জমির মালিক নানা ভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়ে অভিযোগ করছে।

জানতে পেরেছি বন বিভাগের পাহাড়, টিলা উজাড় করে গাছপালা কেটে লোকজনের ক্ষতি করে ঘের করা হচ্ছে। উখিয়া সদর বন বিট কর্মকর্তা আব্দুল মান্নান বলেন, কিছুদিন পূর্বে খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে ঘের মালিককে বনভূমি ও গাছপালা না কাটার জন্য বলে এসেছিলাম। এখন যদি সেটি করে থাকে তার বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট আইনে মামলা দায়ের করা হবে। ঘের নির্মানে বন বিভাগের কোন অনুমতি নেওয়া হয়নি।

উখিয়া বন রেঞ্চ কর্মকর্তা মনিরুল ইসলাম বলেন, সম্প্রতি লোকজনের অভিযোগের প্রেক্ষিতে উক্ত মৎস্য ঘের পরিদর্শন করে বেশ কিছু স্থানে পাহাড়, টিলা ও গাছ কাটার প্রমাণ পাওয়া গেছে। উক্ত ঘের মালিকের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে তিনি জানান। উক্ত ঘের মালিক মৌলভী সিরাজুল ইসলামের হয়ে তার ছোট ভাই ডাক্তার সুরত আলম ঘেরের যাবতীয় কর্মকান্ড পরিচালনা করে থাকেন। তিনি জানান এলাকা উন্নত করতে গেলে টুকটাক কিছু ক্ষতি মেনে নিতে হয়। পরিবেশ অধিদপ্তর, বন বিভাগ বা মৎস্য অধিদপ্তর সহ কোন সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থার পূর্ব অনুমতি নেওয়া হয়নি বলে তিনি স্বীকার করেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.