বগুড়ায় হাসপাতালের গাছতলায় সন্তান প্রসবের ঘটনায় ডাক্তার-নার্সকে হাইকোর্টে তলব

04 শেরপুর(বগুড়া)প্রতিনিধি: বগুড়ার শেরপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গভীর রাতে অন্তঃসত্ত্বা নারীকে তাড়িয়ে  দেওয়ার পর ওই কমপ্লেক্সের মাঠের গাছতলায় সন্তান প্রসবের পরে নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মোখলেছুর রহমান ও সিনিয়র স্টাফ নার্স সুষমা রানীকে তলব করেছেন হাইকোর্ট।

অপরদিকে ঘটনার সুষ্ঠ তদন্তের জন্য সংশ্লিস্ট হাসপাতালের চিকিৎসক ব্যতিত ৩ সদস্য বিশিষ্ট কমিটি গঠন করেছে সিভিল সার্জন। এ সংক্রান্ত খবর গত ১ ডিসেম্বর ঢাকার বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে প্রকাশ হওয়ার প্রেক্ষিতে আইনজীবী শামীম সরদার বিষয়টি আদালতের নজরে আনলে বিজ্ঞ আদালতের বিচারপতি কাজী রেজা-উল হক ও বিচারপতি মোহাম্মদ উল্লাহর হাইকোর্ট বেঞ্চ স্ব-প্রণোদিত হয়ে মানবিক দিক বিচার করে বৃহস্পতিবার (০১ ডিসেম্বর) এ আদেশ দেন।

আদেশে আগামী ১৪ ডিসেম্বর হাইকোর্টে স্ব-শরীরে হাজির হয়ে এ বিষয়ে ব্যাখ্যা দিতে বলা হয়েছে। একই সঙ্গে ঘটনার তদন্ত করে জেলা প্রশাসককে একটি প্রতিবেদন দিতে হবে বলেও আদেশে বলা হয়েছে।
এছাড়াও দায়ীদের বিরুদ্ধে কেন ব্যবস্থা নেওয়া হবে না তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেছেন আদালত। আদেশের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল তাপস কুমার বিশ্বাস।

উল্লেখ্য শেরপুর উপজেলার গাড়িদহ ইউনিয়নের গাড়িদহ স্কুলপাড়া গ্রামের বাসিন্দা ইলিয়াছ উদ্দিনের স্ত্রী দশ মাসের অন্তঃসত্ত্বা মাজেদা বিবির দ্বিতীয় সন্তান জম্মের প্রসব বেদনা উঠে। এরপর রাতেই তাকে শেরপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপে¬ক্সে নেয়া হয়।  সেখানে চিকিৎসা সেবা না পেয়ে রাত  সোয়া ১টার দিকে বাহিরে এসে অন্তঃসত্ত্বা মাজেদা হাসপাতালের মাঠে  প্রসব বেদনায় ছটফটরত অবস্থায় অন্ধকারে খোলা মাঠে নারকেল গাছের তলায় বালু মাটির ভেতরে বাচ্চা প্রসব করে এবং পরবর্তীতে ওই নবজাতকের মৃত্যু হয়।

এ ঘটনায় নবজাতকের বাবা ইলিয়াছ উদ্দিন সংশ্লিস্ট দোষীদের বিচার  চেয়ে সিভিল সার্জনের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন বলে জানান উপজেলা স্বাস্থ্য প.প.কর্মকর্তা ।

এ প্রসঙ্গে ভুক্তভোগী ইলিয়াছ উদ্দিন জানান, প্রসব বেদনা উঠলে স্ত্রী মাজেদা বেগমকে রাত ১১টার দিকে হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নিয়ে আসেন। দায়িত্বরত চিকিৎসক মোস্তফা আলম আল্লামা তালুকদার পিয়াল তাকে ভর্তি  নেন। এক ঘণ্টা পর তাকে ডেলিভারি কক্ষে  নেওয়ার কথা। কিন্তু সিনিয়র স্টাফ নার্স সুষমা রানী মাজেদাকে পাশের মডার্ন ক্লিনিকে নিয়ে ডা. রাফসান জাহান রিম্মীর কাছে সিজার করার জন্য পরামর্শ দেন। মাজেদাকে কয়েকটি ট্যাবলেট খাইয়ে দিয়ে দরজা বন্ধ করে ঘুমিয়ে পড়েন।

তিনি আরও জানান, নগদ টাকা না থাকায় নার্সকে ডেকে তোলেন স্বজনরা। মাজেদাকে হাসপাতালে রেখেই চিকিৎসা করানোর অনুরোধ জানান। এ সময় ইনডোর বিভাগের আয়া পারভীন বিবি যন্ত্রণাকাতর মাজেদাকে জোর করে হাসপাতাল থেকে বের করে দেন। রাত তখন পৌনে ১টা। কোনো যানবাহনও ছিল না। রোগীকে বাইরে নিতে গেলে গেটের কাছে চিৎকার দিয়ে পড়ে যান মাজেদা। অন্ধকার খোলা মাঠে নারকেল গাছের তলায় বালু মাটির ওপর বাচ্চা প্রসব করেন তিনি। অন্তঃসত্ত্বা মাজেদার চিৎকার শুনে হাসপাতাল রোডের নৈশপ্রহরী(গার্ডেনার) ফজলু মিয়া ও পথচারী রিন্টু এসে দরজা ধাক্কাধাক্কি করে ঘুম থেকে ডেকে তোলেন নার্স সুষমা ও হাসপাতালের নৈশপ্রহরী কাজলকে। পরে ডাক্তার পিয়াল ও নার্স সুষমা এসে বালু মাটিতে পড়ে থাকা শিশুকে মৃত ঘোষণা করেন। অথচ জন্মের সময় শিশুটি বেঁচে ছিল।

ডিউটিরত মেডিকেল অফিসার ডা.মোস্তফা আলম আল্লামা তালুকদার পিয়াল জানান, নির্ধারিত সময়ের আগেই তার প্রসব বেদনা ওঠে। পিভিসহ কিছু সমস্যা থাকায় অপেক্ষা করা হয়েছিল। প্রসব বেদনায় ছটফটরত রোগীকে কেন হাসপাতাল  থেকে বের করে দেওয়া হলো? তা আমার জানা ছিলনা।
এ বিষয়ে কর্তব্যরত নার্স সুষমা রানী বলেন, তাড়িয়ে দেওয়া হয় নাই ওই রোগীকে, তবে বাইর থেকে ওষুধ কিনে আনার জন্য পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল।

বগুড়া সিভিল সার্জন ডা. অর্ধেন্দু দেব বলেন, শেরপুর উপজেলা পরিবার-পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা.   মোখলেছুর রহমান ফোনে বিষয়টি আমাকে জানিয়েছিলেন। পরবর্তীতে তিনি বৃহস্পতিবার বেলা ১২টার দিকে শেরপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পরিদর্শন করেন। তবে ঘটনার সুষ্ঠ তদন্তের স্বার্থে তিনি সির্ভিল সার্জন অফিসের ডেপুটি সিভিল সার্জন ডা. এটিএম নুরুজ্জামান, দুপচাচিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মেডিকেল অফিসার ডা. আব্দুল ওয়াদুদ ও সারিয়াকান্দি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সিনিয়র কনসালটেন্ট ডা, হাসিনা আকতার কে নিয়ে ৩ সদস্য বিশিস্ট তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে মর্মে উপস্থিত স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মীদের জানান।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.