সিরাজগঞ্জের তাড়াশে শারীরিক প্রতিবন্ধী জয়ের অদম্য প্রচেষ্টা

04তাড়াশ (সিরাজগঞ্জ) থেকে আশরাফুল ইসলাম আসিফ: সুশান্ত কুমার সরকার। শৈশবে পোলিও  আক্রান্ত গুরুতর শারীরিক প্রতিবন্ধী। কোমরের নিচের অংশ থেকে দু’পায়ের তালু পর্যন্ত একেবারেই স্পর্শহীন। “হুইল চেয়ার বা কোলে-পিঠে যাকে বয়ে বেড়ানোর কথা, সেই বয়ে চলেছে দিন-রাত মানুষের বোঝা।” এযেন শারীরিক প্রতিবন্ধী সুশান্ত সরকারের প্রতিবন্ধিতা জয়ের অদম্য প্রচেষ্টা।

সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলার তালম ইউনিয়নের তারাটিয়া গ্রামের প্রফুল্ল মজুমদারের সন্তান সুশান্ত (৩৩)। মায়ের নাম কুলু রাণী। তিনভাই এক বোনের মধ্যে সুশান্ত মেজ। ২০০৩ সালে পার্শ্ববর্তী জেলা বগুড়ার শেরপুর উপজেলার হরিদাসের মেয়ে শিল্পী রাণীর সাথে সাত পাকে বাধা পড়েন। বর্তমানে সুশান্ত সাত মাসের ফুটফুটে কন্যা সন্তানের বাবা।

সুশান্তর গানের কণ্ঠ বেশ মিষ্টি। হারমোনিয়াম, তবলা, কঙ্গো, ঝুনঝুনির মত বাদ্যযন্ত্রও ভাল বাজাতে জানে। সেই দক্ষতা কাজে লাগিয়ে জীবিকার প্রয়োজনে তার স্ত্রী শিল্পী রাণীর সাথে সুদুর রাজধানী ঢাকায় বিভিন্ন পন্যে  বিক্রিতে নিজের গানের কণ্ঠ ব্যবহার করে দু’মুঠো ভাতের যোগার করত। তবে দিন শেষে মাথা গোজার ঠাই হত মাজারে বা ফুট পথে। এছাড়া বউ সাথে নিয়ে জীবিকা নির্বাহের সামাজিক প্রতিবন্ধকতাতো রয়েছেই।

প্রতিবন্ধিতাযুক্ত দূর্বল-ক্লান্ত শরীর নিয়ে আর কত! তাইতো স্থানীয় গ্রামীন ব্যাংক সমিতি থেকে কিছু টাকা ঋণ নিয়ে একটি পুড়াতন অটো ভ্যানগাড়ি কিনে নিজ এলাকাতেই জীবিকার চেষ্টা করছে সুশান্ত। প্রতিদিন গ্রামের পাশের অতি পরিচিত রাণীহাট বাজার থেকে নিকটবর্তী গ্রামগুলোতে আবার কখনওবা যাত্রী নিয়ে চলছে দূর দূরান্তে।

সুশান্ত বলেন, তার অটো ভ্যানগাড়িটি বেশ পুরাতন হওয়ায় মাঝে-মধ্যেই তাকে সমস্যায় পড়তে হয়। অটো ভ্যানগাড়ি সাধারণত চলতে-চলতে থেমে গেলে চালক মাটিতে নেমে ধাক্কা দিয়ে আবার চালু করেন। কিন্তু আমার দু’টি পা নাথাকায় তা সম্ভব হয় না। অসহায়ের মত তাকিয়ে থাকতে হয় অন্যের সহয়তার জন্য। এমন বিব্রতকর অবস্থায় পড়লে ভ্যান যাত্রীরাও বিরক্ত হয়ে পড়েন।  অনেকে আবার প্রতিবন্ধী মানুষ আর পুরাতন ভেবে আমার ভ্যানে যেতেই চায়না। আমার গাড়িটি একেবারে নতুন হলে ব্যাটারীগুলোও নতুন থাকতো আর চার্জও বেশি সময় যেত।

একটি নতুন অটো ভ্যানগাড়ি একবার রাতভর বিদ্যুতে চার্জ দিলে দিনভর নির্দিধায় চালানো যায়। কিন্তু আমার গাড়িটি পুরাতন হওয়ায় সকালে ভ্যান নিয়ে বেড় হয়ে কিছু সময় চালিয়ে আবারও বাড়িতে গিয়ে চার্জ করিয়ে রাস্তায় নামতে হয়।

গাড়িটি একেবারে নতুন হলে পরিচিত-অপরিচত সকলেই আমার ভ্যানে যাতায়াত করতো। ভাবতো আমি প্রতিবন্ধী মানুষ হলেও আমার অটো ভ্যানগাড়িটি নতুন। রাস্তার মাঝে অথবা খানাখন্দে ধাক্কা দেয়ার প্রয়োজন হবেনা। অন্য দশজন ভ্যানগাড়ি চালকের মত আমিও যাত্রী সাধারণদের সময়মত গন্তব্যে পৌঁছে দিতে পারতাম। অন্যান্য অটো ভ্যানগাড়ি চালকদের প্রতিদিন তিনশো থেকে চারশো টাকা উপার্জন হলেও পুরাতন গাড়ি হওয়ায় সুশান্তর পক্ষে একশো থেকে একশো পঁঞ্চাশ টাকার বেশি উপার্জন করা  সম্ভব হয়না।

অনেকটাই সত্য যে, প্রতিবন্ধিতা আর দারিদ্রতার নিবীর সম্পর্ক রয়েছে। সুশান্তও এর বাইরে নয়। ভূমিহীন অতি দরিদ্র পরিবারের সন্তান সুশান্ত। চারভাই বোনের বোনটির বিয়ে হয়েছে।  অন্য দুইভাইও বিয়ে করে ভিন্ন সংসার করছে। বৃদ্ধ, অসুস্থ মা-বাবা। তাও আবার দীর্ঘদিন যাবৎ বাবা বিছানায় পড়ে আছে। মাথা গোজার ঠাই বলতে সুশান্তর একটি ছোট্র ঘর ছাড়া আর কিছুই নেই। মা-বা, স্ত্রী, কন্যা সহ পরিবারের পাঁচজন সদস্য সুশান্তর একশো থেকে একশো পঁঞ্চাশ টাকা উপার্জনের ওপর নির্ভরশীল। খেয়ে না খেয়ে সাত মাসের কন্যা অনজলী বালা সহ সকলেই নিদারুণ পুষ্টি হীনতায় ভুগছে। পাঁচজন যেন পল্লী কবি জসিম উদ্দিনের আসমানী কবিতার বাস্তব উদাহরণ। “সাক্ষী দিচ্ছে অনাহারে কয়দিন গেছে তার”

সুশান্ত আরো বলেন, সমাজে অনেক বিত্তবান রয়েছেন। তাদের সংখ্যা আমাদের মত সুশান্তদের তুলনায় বহুগুণ বেশি। অন্তত আমার শিশু সন্তানের মুখের পানে চেয়ে কেউ যদি আমাকে একটি নতুন অটো ভ্যানগাড়ি কেনায় সহায়তা করতো তাহলে তিনবেলা দু’মুঠো ডালভাত খেয়ে বাঁচতে পারতাম!  আর গুরুতর শারীরিক প্রতিবন্ধী হওয়া সত্বেও ভিক্ষাবৃত্তি না করে হয়তবা প্রতিবন্ধিতাকে সত্যিই জয় করতে পারতাম।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.