মানবতাবিরোধী ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞ নরসিংদীর নিলক্ষায়,গোরস্থান আর মসজিদ ছাড়া সব ছারখার

%e0%a7%a6%e0%a7%aaএশিয়ানবার্তা নিউজটিম : একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানিরা যেমনে বাঙ্গালিগো ঘরবাড়ি ভাংসে, আগুন দিসে আমাগো এখানের অবস্থা দেইখা মনে হয় (নিলক্ষা ইউনিয়নের দঁড়িগাও, হরিপুর ও বীরঁগাও পশ্চিম পাড়া) এইটা আরেকটা একাত্তর হইয়া গেছে, খালি মানুষ মরছে না একাত্তরের মতো। এইসব তো অন্যদেশের মানুষ করে নাই। এইজন্য একাত্তরের চেয়ে এখনেরটা খারাপ।
কথাগুলো বলছিলেন নিলক্ষা ইউনিয়নের বাসিন্দা মুক্তিযোদ্ধা আবদুল লতিফ। মুক্তিযুদ্ধে তিনি কমান্ডারের দায়িত্বে ছিলেন। সরেজমিনে আমাদের প্রতিনিধি দঁড়িগাও, হরিপুর ও বীরগাঁও পশ্চিম পাড়ায় শত শত বাড়িঘরে যে ধরনের ধ্বংসলীলা প্রত্যক্ষ করেছেন, তা প্রচন্ড ভয়াবহ। ঠিক মুক্তিযোদ্ধা আবদুল লতিফের দেয়া বর্ণনা। কবরস্থান ও মসজিদ ছাড়া এমন কোনোকিছু নেই, যা ধ্বংস করা হয়নি। চারিদিকে সবকিছু ছারখার হয়ে গেছে।
শনিবার সকালে আমাদের নিউজটিম প্রথমে যায় দঁড়িয়াও গ্রামের একটি অংশে। স্থানীয়ভাবে দঁড়িগাও ছক্কার মোড় নামে পরিচিত অংশে নেমে প্রবেশ করতে হয় ধ্বংসযজ্ঞ চালানো স্থানে। প্রায় আধঘণ্টা এলাকাটি ঘুরেও দেখা যায়, একটি মসজিদ ছাড়া এখানের প্রায় শতাধিক ঘরবাড়ি পুড়িয়ে ছারখার করে দেয়া হয়েছে। আগুনের লেলিহান শিখায় ঘরের সব ধরনের জিনিসপত্র পুড়েছে তো বটেই, উঠানে থাকা গাছগাছালিও পুড়ে মরেও গেছে, নয়তো কোনোমতে বেঁচে আছে। আধপাকা, আধ দেয়াল করে নির্মিত বসতঘরগুলো পুড়ে কয়লা, ঘর সংসারের কাজে ব্যবহৃত আসবাবপত্র থেকে শুরু করে যা ব্যবহার করা হয়, কোনো কিছু অক্ষত নেই। কাঠের খুঁটি, সিমেন্টের খুঁটি, ঢেউটিন- সব পুনরায় ব্যবহার অনুপোযোগী হয়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে মাটিতে। শুধু বসত ঘরই নয়, রান্নাঘর, গোয়ালঘর, লাকড়ির ঘর, গরুর পানি পানের গামলা, কবুতরের খোপ, উঠানে থাকা খড়ের গাদা, গৃহপালিত পাখির খোয়াড়, বিদ্যুতের খুঁটি, তার মিটার- সবই ছারখার। ধ্বংস স্ত’পগুলোর চারদিকে কোনো মানুষজনের শব্দ পাওয়া যায় না, কুকুর-বিড়ালও নেই। গাছগাছালি, পোকামাকড় ছাড়া সেখানে কোনোপ্রাণের অস্তিত নেই। যাদের ঘরবাড়ি ধ্বংসের শিকার, তারা একদমই এলাকা ছাড়া।
একটি ঘর দেখিয়ে পার্শ্ববর্তী হরিপুর গ্রামের বৃদ্ধা হাজেরা খাতুন বলেন, এইটা নজ আলী মেম্বারের (নিলক্ষা ইউনিয়নের সাবেক মেম্বার) ঘর। হেরা সব কই জানি গেছে গা। দেখা যায়, এ বাড়ির আধপাকা ঘরের দেয়ালে আগুনের মৃত রূপ, দেয়াল ভেঙে দেয়া হয়েছে। পুরো উঠান জুড়ে ছাই আর ছাই। দাঁড়িয়ে থাকা সাজনা গাছ, পেয়ারা গাছ, নারিকেল গাছ- পুড়ে আছে। তরব আলী, ইদ্রিস আলী, মানিক, ফারুক, জাকিরের বাড়িঘরের অবস্থা একই। গত ১২ থেকে ১৪ নভেম্বর পর্যন্ত চলা রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ এসব দৃশ্যের জন্মদাতা। আর এসব দৃশ্যের জন্মদাতা নিলক্ষা ইউনিয়নের বর্তমান চেয়ারম্যান তাজুল ইসলাম ও সাবেক চেয়ারম্যান আবদুল হক সরকার। তাদের সমর্থকরাই এসব মানবতা বিরোধী অপরাধ ঘটিয়েছে।
দঁড়িয়াগ্রামের ক্ষতিগ্রস্ত অংশে দেখা যায়, ১৩ নভেম্বও সে অংশে হামলা চালানো হয়। অভিযোগ পাওয়া গেছে- আবদুল হক সরকার সমর্থক, দঁড়িগাও দক্ষিণ পাড়ার বাসিন্দা নিলক্ষা ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক মেম্বার সফি মিয়ার নেতৃত্বে এই তা-ব চালানো হয়েছে। দাঙ্গাবাজরা ছিল- আবদুল হক সমর্থিত আমিরাবাদ, সোনাকান্দি গ্রামের বাসিন্দা এবং ভাড়াটে লাঠিয়াল বাহিনী। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এ গ্রামেরই একজন বাসিন্দা জানিয়েছেন, সফির সঙ্গে ছিল ফেলু মিয়া।
এরপর আমাদের নিউজটিম যায়, দঁড়িগাও থেকে পাকা-কাঁচা রাস্তা দিয়ে পায়ে হেঁটে ৩০ মিনিটের পথ পাড়ি দিয়ে হরিপুর গ্রামে। সেখানে সুবেদ আলী মেম্বারের (নিলক্ষা ইউনিয়নের সাবেক মেম্বার) বাড়ির অংশে। সেখানের অবস্থাও দঁড়িগাঁওয়ের মতো। ১৩ নভেম্বরই এখানে হামলা চালায় সফি ও ফেলু মিয়া। এখানেও অন্তত একশ ঘরবাড়িতে তান্ডব চালানো হয় বলে জানান স্থানীয় বাসিন্দা বৃদ্ধ মেহের আলী।
হরিপুরের আবু তাহেরের বাড়ির মুরগির খোয়াড় পড়েছিল মাটিতে। এখানে একটি মুরগি পাওয়া যায়, পুড়ে মরে আছে। আসলাম মিয়ার বাড়ির উঠানে দেখা যায়, কবুতরের খোপ পড়ে আছে। আর বসতঘর, রান্নাঘর, গোয়ালঘরসহ সবকিছু তো পুড়ে আছেই।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, পুড়ে যাওয়া ঘরবাড়ির লোকজন ছিলেন নিলক্ষা ইউনিয়নের বর্তমান চেয়ারম্যান তাজুল ইসলাম সমর্থক। বর্তমানে তারা সবাই এলাকা ছেড়ে নরসিংদী সদর, রায়পুরা সদর, বারৈচা, ভৈরব, ঢাকায় অবস্থান করছেন।
বীরগাঁও গ্রামের পশ্চিম পাড়ায় আবদুল হক সরকারের পৈত্রিক নিবাস। শুক্রবার দুপুরে সেখানে দেখা গেছে, দঁড়িগাও এবং হরিপুরের মতো তা-বের হাজারো আলামত। এ তা-ব চালানো হয়েছিল গত ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের পরপরই মে মাসে। পশ্চিম পাড়াতেও প্রায় ১০০ ঘরবাড়ি ধূলিস্মাৎ। অভিযোগ আছে- এখানে হামলা চালানো হয় সুমেদ আলীর নেতৃত্বে। দাঙ্গাবাজরা ছিল- হরিপুর, বীরগাঁও, গোপীনাথপুরের, সঙ্গে ছিল ভাড়াটে লাঠিয়ালও। ধ্বংসযজ্ঞ চালানো এলাকাগুলো পরিদর্শনে আরও দেখা গেছে, এখানকার মসজিদগুলো অচল প্রায়, কোনোটা বন্ধ আছে মাসের পর মাস ধরে, স্কুলগুলোয় শিক্ষার্থীর যাতায়াত হ্রাস পেয়েছে। পশ্চিম পাড়ার মতি মিয়ার বাড়ির খুবই কাছে অবস্থিত একটি জামে মসজিদ। গত মে মাসে পশ্চিম পাড়ায় হামলার পর থেকে এটি এখন পর্যন্ত তালাবদ্ধ বলে জানান মন্নর আলী।
পশ্চিম পাড়ায় হামলা মে মাসে হলেও এখন পর্যন্ত সেখানে ক্ষতিগ্রস্ত বাড়িগুলো পড়ে আছে সেভাবেই। বাড়ির মালিকরা কেউ আসেন না। এ অবস্থায় সেখানে ভয়াবহ নীরবতা বিরাজমান।
পশ্চিম পাড়ার একটি কবরস্থান, যা সরকার বাড়ির পারিবারিক। এ পাশে একটি আনুমানিক ৮০ শতক করে পাশাপাশি দুটো পুকুর আছে। মন্নর আলী জানান, হামলার সময় জাল দিয়ে পুকুর থেকে মাছও ধরে নিয়ে যাওয়া হয়।
আবদুল হক সরকারের বাড়ির সীমানায় প্রবেশ করতেই চোখে পড়ে সরকার বাড়ি জামে মসজিদ। হামলার পর থেকে সেখানে মুসল্লির সংখ্যা অস্বাভাবিকভাবে কমে গেছে। প্রতি ওয়াক্তে চার-পাঁচজনের বেশি মুসল্লি আসেন না। এখানে বর্তমানে মুয়াজ্জিনের দায়িত্ব পালনকারী মন্নর আলী জানান এসব তথ্য। মসজিদ পার হলেই সরকার বাড়ির মূল অংশ শুরু। প্রথমেই পড়ে একটি আধপাকা ঘর। যেখানে আবদুল হক সরকার পরিবারসহ থাকতেন। সেটির দেয়াল ভেঙে ভেতরের সবকিছু তছনছ কওে দেয়া হয়েছে। এছাড়া তার বাড়ির আরও ৬টি ঘরও তছনছ। তার বাড়ির কাছেই বীরগাঁও পশ্চিমপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। এর একজন শিক্ষক নাম না প্রকাশের শর্তে জানান, শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি খুবই কম। হামলার সময় দেয়ালে ককটেল ফাটানো হয়।
পশ্চিম পাড়ার সরকার বাড়ি ছাড়াও যেসব বাড়িতে হামলা চালানো হয়, সেসব বাড়ির লোকজন আবদুল হকের সমর্থক, নিকটাত্মীয় হওয়ায় ধ্বংস করা হয় বলে জানা যায়। আবদুল হক সরকারের কোনো আত্মীয়স্বজন বর্তমানে এলাকায় থাকেন না।
এদিকে, বর্তমানে এলাকায় খবর আছে- আবদুল হক সরকারের লোকজন বীরগাঁও বড়বাড়িতে হামলা চালাবে। এ আশঙ্কা থেকে শুক্রবার রাতে জেলা প্রশাসন নিলক্ষায় ১৪৪ ধারা জারি করেছে। এর প্রভাবে এলাকাটি মৃতপ্রায় হয়ে গেছে, সবদিক দিয়েই। শত শত পুলিশ দায়িত্ব পালন করছেন সেখানে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.