সিরাজগঞ্জের কাজিপুর চরবাসির যমুনা পারাপারে একমাত্র সম্বল নৌকা

07কাজিপুর (সিরাজগঞ্জ) থেকেটি এম কামাল: আজগর আলী। সিরাজগঞ্জের কাজিপুরের চরাঞ্চলের প্রবীণ এই ব্যক্তির জন্ম ১৯৩৩ সালে। তখন থেকে যমুনার পূর্বপাড়ের বাসিন্দা তিনি। বাব-দাদার মতো তিনিও ছোটবেলা থেকে অদ্যাবধি নৌকায় চেপে যমুনা পারাপার হচ্ছেন। আগে অবশ্য যমুনা শীর্ণকায় থাকলেও গত তিন যুগে তা প্রসারিত হয়ে কাজিপুর অংশে এখন প্রায় ১২ কিমিঃ পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে। ফলে কাজিপুর সদরের সাথে যোগাযোগ রাখতে নৌকাই একমাত্র ভরসা। অনেক প্রতিশ্রুতি অনেক আশার স্বপ্ন বিভিন্ন সময়ে দেখানো হলেও বাস্তবতা হচ্ছে যমুনা এখনও বন্ধনহীন। অশীতিপর আজগর আলীর মতো চরের অসংখ্য মানুষের যমুনা জয়ের একমাত্র সম্বল হলো নৌকা। চরের মানুষের যাতায়াতের প্রধান খেয়া ঘাট হচ্ছে মেঘাই ও নাটুয়ারপাড়া খেয়া ঘাট।

এছাড়া তেকানি, মনসুরনগর, খাসরাজবাড়ী, নিশ্চিন্তপুর, চরগিরিশ, ঢেকুরিয়া, মাইজবাড়িসহ বিভিন্ন এলাকায় এরকম আরো একাধিক খেয়া ঘাট রয়েছে। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত এসব খেয়া ঘাট থাকে কর্ম চঞ্চল। হিং¯্র যমুনার বিস্তীর্ণ জলরাশি মাড়িয়ে নৌকাযোগে এসব চরাঞ্চলের মানুষকে যাতায়াত করতে হয় নিয়মিত। ব্যবসা বাণিজ্যের কাজেও পাড়ি দিতে হয় নৌকায়। পণ্য আনা-নেওয়ার কাজে নৌকার নেই কোন বিকল্প। তবে এক্ষেত্রে যে যার মত সুবিধা অনুযায়ি ছোট-বড় নৌকা ব্যবহার করে থাকেন। সবমিলিয়ে নৌকায় ভেসে জনম পার করছেন চরাঞ্চলবাসী।

সিরাজগঞ্জের কাজিপুর উপজেলার বেশ কয়েকটি চরাঞ্চল ঘুরে এরকম তথ্য পাওয়া গেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, উপজেলার মোট ১২টি ইউনিয়নের মধ্যে ৬টি ইউনিয়ন যমুনার বুকে জেগে ওঠা বড় বড় চরের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। এরমধ্যে রয়েছে নাটুয়ারপাড়া, খাসরাজবাড়ী, তেকানী, নিশ্চিন্তপুর, মনসুর নগর, চরগিরিশ ইউনিয়নের নাম। এসব ইউনিয়নে প্রায় লক্ষাধিক মানুষ বসবাস করেন। যাদের চলাচলের একমাত্র পথ পানিতে টুইটম্বর যমুনা। আর বাহন হলো শুধুই নৌকা। বাইরের কেউ এসব এলাকায় যেতে চাইলে তাদেরকেও একইপথ ও বাহন ব্যবহার করতে হয়। তখন ভর দুপুর। নাটুয়ারপাড়া খেয়া ঘাট। ঘাটের পাশেই রয়েছে বেশ কিছু গাছপালা ও উচুঁ স্থান। সেই স্থানে টানানো ছাউনির নিচে বেশ কিছু চেয়ার রাখা হয়েছে। খেয়া ঘাটের এই স্থানে দেখা গেলো মানুষের জটলা। সবাই নৌকা আসার অপেক্ষায় বসে বা দাঁড়িয়ে রয়েছেন। আবার যাত্রী বা পণ্য বোঝাই করে অনেক নৌকাকে যমুনার বুক চিরে আসা-যাওয়া করতে দেখা গেলো। কলেজ ছাত্রী জুলেখা। কাজিপুর সরকারি মনসুর আলী কলেজে লেখাপড়া করেন।

বাড়ি নাটুয়ারপাড়া চরে। কলেজ চলাকালীন সময়ে তাকে প্রত্যেক দিন এই খেয়া ঘাট হয়ে নৌকা যোগে চলাচল করতে হয়। মিলি আকতার নামে আরেক কলেজছাত্রী এ প্রতিবেদককে জানান, তাদের পূর্ব পুরুষরা এখানে জন্ম গ্রহণ করেছেন। তারও জন্ম এখানে। জমিজমা বলতে যা তা এখানেই আছে। বসতবাড়িও এখানে। সংসারও অভাবী। তাই ইচ্ছে থাকলেও শহরে যাওয়া যায় না। কেননা শহরের থাকতে হলে জায়গা জমি কিনতে হবে। বাসাবাড়ি বানাতে হবে। সেই সামর্থ্য পরিবারের নেই। এ কারণে যমুনা ছাড়ার কোন উপায় নেই। আর ছোট থেকে নৌকায় চড়তে চড়তে ভয়ও ভেঙে গেছে। টুকু মন্ডল, রফাতুল্লাহ সরকার, সেকেন্দার বৈরাগীসহ একাধিক ব্যক্তি জানান, আগে তো অনেক ছোট নৌকায় যাতায়াত করতে হতো। যে সময় নৌকায় পাল ব্যবহার করা হতো। এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যেতো অনেক সময় লাগাতো। কিন্তু আগের সেই জামানা আর নেই।

এখন সব নৌকায় চলছে শ্যালোমেশিন দিয়ে। নৌকাও আকারে বেশ বড়। সংখ্যাও অনেক। মানুষের পাশাপাশি পণ্য বহনের কাজে এখন বড় বড় নৌকা ব্যবহার হচ্ছে বলে জানান চরাঞ্চলে বসবাসকারী এসব ব্যক্তিরা। এখন চরে স্শাপিত হয়েছে দুটি কলেজ, সরকারি একটি ব্যাংক, বেশকটি উচ্চ বিদ্যালয়, প্রাথমিক বিদ্যালয়, মোবাইল ফোন টাওয়ার, পুলিশ ফাঁড়ি সহ নানা স্থাপনা। শুধু হয়নি যাতায়াতের সুব্যবস্থা। তাই চরবাসি সবার দাবী যমুনাকে সেতু অথবা বাধ দিয়ে মূল চরের সাথে সংযোগ করে দেবার। কিন্তু সেই প্রত্যাশা পূরণের পথে আর কতদিন তাকিয়ে থাকতে হবে তা তাদের জানা নেই।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.