রামেকে চিকিৎসাসেবার নামে তান্ডব চালাচ্ছে ছাত্রলীগ ইন্টার্নরা

05রাজশাহী বুরো প্রতিনিধি: : লাঠি-সোঠা আর পিস্তল হাতে নিয়ে রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ওয়ার্ডে চিকিৎসাসেবার নামে তা-ব চালাচ্ছেন ছাত্রলীগ শিক্ষানবিশ (ইন্টার্ন) চিকিৎসকরা। রামেক হাসপাতালজুড়ে সাম্প্রতিক সময়ে এমন দৃশ্যই চোখে পড়ছে একেরপর এক। এ নিয়ে চরম অস্থিতরতা ছড়িয়ে পড়েছে এ হাসপাতালটিতে। চিকিৎসা না পেয়ে রোগী মারা গেলে বা আরো বেশি অসুস্থ হয়ে পড়লে তার প্রতিবাদ করতে গেলেই স্বজনদের ওপর হামলে পড়ছেন ওই চিকিৎসকরা। এতে শিক্ষানিবশ চিকিৎসকের মারমুখি আচরণেই হাসপাতালে ভেঙে পড়েছে চিকিৎসাসেবা।

হামলার পর ওয়ার্ডে আটকে রেখে পরে পুলিশে সোপর্দ করা হচ্ছে রোগীর স্বজনদের। ফলে কখনো কখনো লাশ ফেলে রেখেই স্বজনদের যেতে হচ্ছে থানাহাজতে। আবার কখনো কখনো রোগীকে ধরেও মারপিট করছেন শিক্ষানিবিশ চিকিৎসকরা।
মাঝে মাত্র এক দিনের ব্যবধানে সর্বশেষ গতকাল মঙ্গলবার আবারো এক রোগীর দুই স্বজনকে পিটিয়ে রক্তাক্ত জখমের পরে তাঁদের পুলিশে সোপর্দ করা হয়েছে।

শিক্ষানবিশ চিকিৎসকদের হামলার শিকার রোগীর ওই দুই স্বজন হলেন, জেলার পুঠিয়া উপজেলার কাঠালবাড়িয় গ্রামের নাহিদ হোসেন (২৬) ও নাটোরের একডালা বাবুপুকুর গ্রামের সাদ্দাম হোসেন (৩০)। ঘটনাটি ঘটে হাসপাতালের ১৬ নম্বর ওয়ার্ডে।

এর আগে গত ১৩ নভেম্বর দুপুরে রামেক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় এক রোগীর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে ইন্টার্ন চিকিৎসকরা মৃত রোগীর দুই স্বজনকে পিটিয়ে আহত করে পুলিশে সোপর্দ করে। হাসপাতালের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের এ ঘটনাটি ঘটে রামেক ছাত্রলীগের সভাপতি শফিকুল ইসলাম অপুর সঙ্গে।
হামলার শিকার নাহিদ হোসেন ও সাদ্দাম জানান, গত সোমবার রাত পৌনে আটটার দিকে রক্তজনিত সমস্যার কারণে হাসপাতালের ১৬ নম্বর ওয়ার্ডে ভর্তি হন নাটোরের চাঁদপুর এলাকার বৃদ্ধ জয়নাল হোসেন (৭০)। কিন্তু ভর্তি হওয়ার পরে

দুপুর পর্যন্ত তেমন কোন চিকিৎসা পাননি জয়নাল। এ নিয়ে দুপুর ১ টার দিকে জয়নালের আত্মীয় নাহিদ ও সাদ্দাম ওই ওয়ার্ডে দায়িত্বরত ইন্টার্ন চিকিৎসক ও ছাত্রলীগ কর্মী কেএম সালাউদ্দিনের সাথে কথা বলতে যান। কিন্তু সালাউদ্দিন রোগীর ওই দুই স্বজনের সঙ্গে তর্কে জড়িয়ে পড়েন।
একপর্যায়ে সালাউদ্দিনের নেতৃত্বে ৪-৫ জনের একটি দল এসে নাহিদ ও সাদ্দামের উপর হামলা করে। এরপর তাঁদের বেধড়ক পিটিয়ে রক্তাক্ত জখমের পর ওই ওয়ার্ডেই আটকে রাখা হয়। এসময় অন্যান্য রোগী এবং তাদের স্বজনদের মাঝে ব্যাপক আতঙ্কের সৃষ্ট হয়। পরে পুলিশ ডেকে আহত নাহিদ এবং সাদ্দামকে পুলিশের কাছে সোপর্দ করেন শিক্ষানবিশ চিকিৎসকরা।

আহত নাহিদ জানান, তাদের লাঠি এবং রড দিয়ে পেটানোর পর ইন্টার্ন চিকিৎস দের একজন তার হাতে থাকা চাবি দিয়ে খুঁচিয়ে রক্তাক্ত জখম করে। এতে তারা গুরুতর আহত হন। আহত করার পর তাঁদের ওয়ার্ডের মেঝেতে ফেলে রাখেন ওই চিকিৎসকরা। পরে পুলিশ গিয়ে হামলাকারী চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা না নিয়ে উল্টো আহতদেরকেই ধরে নিয়ে আসে।

রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল পুলিশ বক্সের ইনচার্জ উপপরিদর্শক (এসআই) এমদাদুর রহমান বলেন, ‘হাসপাতালের ওয়ার্ড থেকে কোনো চিকিৎসককে আটকের ক্ষমতা আমাদের নাই। বরং তারা যাকে আটক করে আমাদের কাছে দেয়, তাদেরই আটক করতে হয়। তাই আহত হলেও ওই দুইজনকেই আটক করে থানায় নিয়ে যাওয়া হয়।’

হাসপাতালের একাধিক সূত্র এবং রোগীর স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ওয়ার্ডে বসে খোশগল্পে মেতে উঠা, ফেসবুক চালানো, টিভি দেখা থেকে শুরু করে আলিশান সময় কাটান শিক্ষানবিশ চিকিৎসকরা। আর ওই ওয়ার্ডে রোগী মৃত্যু যন্ত্রণায় ছটপট করলেও সেইদিকে কোনো ভ্রুক্ষেপ যেন থাকে না তাঁদের। বার বার ডাকার পরে কখনো কখনো রোগীর কাছে গেলেও তার সেঙ্গ খারাপ আচরণ করা হয়।

আবার নিজের দায়িত্ব থাকা সত্বেও ওয়ার্ডে না থেকে বাইরে গিয়ে আড্ডা দেন শিক্ষানবিশ চিকিৎসকরা। এসময়ে অধিক রোগীর ভীড়ে এক-দুই জন শিক্ষানবিশ চিকিৎসকের ক্ষেত্রে চিকিৎসা দেওয়াও সম্ভব হয়ে উঠে না। আর চিকিৎসাবঞ্চিত রোগীর স্বজনরা এ নিয়ে প্রতিবাদ করতে গেলেই তাদের ওপরে নেমে আসছে অত্যাচার নির্যাতনের খড়গ।

আহত রোগীর স্বজন এবং হাসপাতালের একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে, প্রতিবাদকারী রোগীর স্বজনদের ওপর লাঠি-সোঠা নিয়ে হামলা করা ছাড়াও সাম্প্রতিক সময়ে ছাত্রলীগ নামধারী কয়েকজন শিক্ষানবিশ চিকিৎসক ওয়ার্ডে পিস্তল পকেটে নিয়েও ঘুরে বেড়ান।
গত রবিবার মৃত মহসিন আলীর স্বজনদের ওপর হামলার সময় কয়েকজনকে পিস্তল হাতে ঘুরতে দেখা যায় বলেও দাবি করেন ওই হামলায় আহতরা।  বেপরোয়া এই শিক্ষানবিশ চিকিৎসকদের হামলার শিকার হয়ে কখনো কখনো রোগীও আহতের ঘটনা ঘটছে। চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারপিটের শিকার হয়ে জেলার বাঘা উপজেলার বাসিন্দা ও রোগী মাইনুল ইসলাম রাজশাহী আদালতে একটি মামলাও করেছেন।

গত ১৩ অক্টোবর রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজের শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী লুৎফর রহমানের বিরুদ্ধে এ মামলাটি দায়ের করা হয়। আদালত মামলাটি আমলে নিয়ে রাজপাড়া থানার ওসিকে তদন্তের নির্দেশ দেন। জানতে চাইলে ওই মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই তৌহিদুল ইসলাম বলেন, ‘হাসপাতালের ইন্টার্নি চিকিৎসকদের সঙ্গে রোগীর স্বজনদের মারপিট বা হামলার ঘটনা ক্রমেই বৃদ্ধি পেয়ে চলেছে। সাম্প্রতিক সময়ে এই ধরনের ঘটনা ঘটেছে অন্তত ১৫টি। আর এসব ঘটনা নিয়ে আমরাও বিব্রতকর অবস্থায় আছি।’

রাজশাহী মহানগর পুলিশের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘লাঠি-সোঠা এবং পিস্তল হাতে নিয়ে রোগীর স্বজনদের ওপর হামলা করার ঘটনা নিয়ে ক্রমেই উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ছে রোগী এবং স্বজনরা। তেমনি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির সামাল দিতেও হিমিশিম খেতে হচ্ছে আমাদের। এ অবস্থায় কখন যে হাসপাতালে খুন-খারাবি হয়ে যায় তা নিয়েও দেকা দিয়েছে শঙ্কা।’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক রাজশাহী মহানগর পুলিশের একজন জেষ্ঠ্য কর্মকর্তা বলেন, ‘ঘটনা তদন্ত করতে গেলে অন্তত ৯০ ভাগ ঘটনার পেছনেই ইন্টার্নি চিকিৎসকদের বিপক্ষে যাবে। কিন্তু তদন্ত করে তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে গেলেও সমস্যা। তখন তারা আন্দোলন করে হাসপাতালের পরিবেশ বিনষ্ট করবে। এ নিয়ে আমরাও নিশ্চুপ থাকি। আবার তারা মারপিট করে যেসব রোগীর স্বজনদের ধরিয়ে দেয়, তাদের আটক করে থানায় না নিয়ে আসলেও আন্দোলনের হুমকি দেয়। ফলে ইন্টার্নি ডাক্তারদের এসব আচরণে পুলিশও ক্ষুব্ধ।’

এসব বিষয় নিয়ে জানতে চাইলে হাসপাতালের পরিচালকের পরিচালকের দায়িত্বে থাকা চিকিৎসক মনোয়ারুল ইসলাম বলেন, ‘রোগীর স্বজনদের সঙ্গে কেন একের পর এক এসব অনাকাঙ্খিত ঘটনা ঘটছে, সেটি নিয়ে আমরাও উদ্বিগ্ন। এই ধরনের ঘটনা এড়াতে সমাজের সকলেরই সচেতন হতে হবে। মনে রাখতে হবে আমরা কেউই সমাজের বাইরের কোনো মানুষ নয়। কাজেই হাসপাতালে কেন এই ধরনের ঘটনা ঘটবে? যেখানে মানুষ চিকিৎসা নিতে আসেন সুস্থ হতে। সেখানে এসে মারামারির ঘটনা ঘটবে-এটা মেনে নেওয়া যায় না।’

আরকে প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘পরিচালক সাহেব ছুটিতে আছেন। উনি এলে এসব বিষয় নিয়ে তার সঙ্গে আমরা বসবো। প্রয়োজনে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে এ সমস্যা সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.