বগুড়ার শেরপুরে কৃষকের ঘরে নতুন ধান: মুখে হাসির ঝিলিক

05 শেরপুর (বগুড়া) শফিকুল ইসলাম শরীফ: বাংলা সনের মাস কার্তিক। অগ্রহায়ণের সঙ্গে গা ঘেঁষাঘেঁষি। এ দু’মাস মিলেই হয়েছে হেমন্তকাল। এ ঋতুতেই শিশিরের মতো নিরবে আবির্ভাব। ষড়ঋতুর দেশে নবান্নের সুবার্তা নিয়ে আসে কার্তিক। ফসলের ক্ষেতে সোনালি হাসির ঝিলিক ছড়িয়ে পড়ে। কার্তিকের শুরুতেই থাকে মোলায়েম কুয়াশার চাঁদর আর শিউলি ফুলের  মৃৃদুমন্দ সৌরভ, হিমেল ছোঁয়ায় নরম স্পর্শ। সকাল-সন্ধ্যায় হেমন্তের মিহি কুয়াশার দানাগুলো প্রকৃতিকে বেশ অপরূপ সাজে সাজিয়ে তুলেছে। আশ্বিন  গেল কার্তিক মাসে পাকলে ক্ষেতের ধান/ সারামাঠ ভরি গাইছে  কে যেন হলদি কোটার গান/ধানে ধান লাগি বাজিছে বাজনা, গন্ধ উড়িছে বায়/কলমী লতায় দোলন লেগেছে, হেসে কূল নাহি পায়। নক্সী-কাঁথার মাঠে কবি জসীমউদ্দীন এভাবেই কার্তিকের রূপলাবণ্য বর্ণনা করেছেন।

উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্র জানায়, এই উপজেলার কৃষকরা ২২ হাজার ৩’শ হেক্টর জমিতে রোপা আমন ধান রোপন করেছে। এর উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ২০ হাজার ১৫০   হেক্টর জমিতে যাহাতে গত বছরে হয়েছিল ২২ হাজার ১’শ হেক্টর জমি। এবছর এ উপজেলার কৃষকরা তাদের জমিতে ব্রি ৪৯,ব্রি-৫১,ব্রি-৫২,ব্রি-৫৬, ব্রি-৫৭, ব্রি-৬২, ও ব্রি-৩৪ ধান সহ বিন্না-৭, স্বর্ণা, রনজিৎ, পাইজাম, কাটারীভোগ, সম্পাসহ বেশ কয়েক উন্নতজাতের ধানের আবাদ হয়েছে বেশী।

উপজেলা কৃষি বিভাগ জানিয়েছেন, দুই সপ্তাহ পরে এই উপজেলায় পুরোদমে আমন ধান কাটা ও মাড়াই শুরু হবে। উপজেলার কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মৌসুম শুরুর আগেই ধান কাটা হলে সেই জমিতে রবিশস্য বিশেষ করে আলু ও সরিষা চাষ করা যায়। এ কারণেই তারা এবার মিনিকেট, বিনা-৭ ও ব্রি ধান-৬২ জাতের ধান লাগিয়েছিল। চাষ মৌসুমের শুরু থেকেই বৃষ্টি হওয়ায় আমন ধানের ফলন ভাল হয়েছে। কৃষকরা জানান, প্রতি বিঘা জমিতে বিনা-৭ বিঘায় ১৭ থেকে ১৯ মণ এবং ব্র্রি ধান-৬২ বিঘায় ১৫ থেকে ১৮ মণ করে পাওয়া যাচ্ছে। জমি থেকে কাটার পর মাড়াই করেই বাজারে তুলে কাঁচা ধানের দাম পাওয়া যাচ্ছে বিনা-৭ ধান ৭০০ থেকে ৭৬০ টাকা মণ। উপজেলার মির্জাপুর ইউনিয়নের ভাদাইসপাড়া গ্রামের কৃষক আনিছুর রহমান বলেন, ফলন ও দাম যা-ই হোক জমিটা আগেই খালি হওয়ায় এখন সরিষা চাষ করা হবে। নমলা (বিলম্বে চাষ) ধান লাগালে অন্য ফসল আর লাগানো হতো না।

এবার আগে ভাগেই নবান্নের আমেজ শুরু হয়েছে বগুড়ার শেরপুর উপজেলায়। জমিতে লাগানো আগাম জাতের আমন ধান  কেটে ঘরে তোলা শুরু করেছেন উপজেলার কৃষকরা। চিরায়ত নিয়মে হেমন্তের মধ্যভাগে (১-অগ্রহায়ণ) নতুন ধান ঘরে  তোলার পর বাঙালির নবান্ন উৎসব শুরু হয়। বাংলার কৃষক সমাজ প্রাচীন কাল থেকে নবান্ন উৎসব পালন করে আসছে। কালের বিবর্তনে অনেক কিছু পরিবর্তন হলেও কৃষকরা নবান্ন উৎসব পালন করতে ভুলে যায়নি আজও। গ্রাম বাংলায় কৃষকেরা নবান্ন উৎসব পরিপূর্ণ ভাবে উদযাপনের জন্য মেয়ে জামাইসহ আত্মীয়-স্বজনদের বাড়ীতে আমন্ত্রণ করে এনে নতুন চালের পোলাও, পিঠা ও পায়েসসহ রকমারী নিত্য নতুন খাবার তৈরী করে ধুম-ধামে ভুঁড়ি ভোজের আয়োজন চলছে।

এবিষয়ে উপজেলার তালতা গ্রামের কৃষক আব্দুল বারিক বলেন, গ্রাম্য বধুরা জামাইকে সাথে নিয়ে বাপের বাড়ীতে নবান্ন উৎসব করার জন্য অধির আগ্রহে অপেক্ষা করে। নবান্ন উৎসবে গ্রামের কৃষকেরা মিলে-মিশে গরু, মহিষ ও খাঁসি জবাই করে। হাট-বাজারের বড় মাছ কিনে আনে। এই নিয়মের ধারাবাহিকতায় কৃষকদের ঘরে ঘরে চলছে এখন ঐতিহ্যবাহী নবান্ন আমেজ। সব-মিলিয়ে শেরপুর উপজেলার কৃষকেরা নবান্ন উৎসব পালনের সর্বাত্মক প্রস্তুতি নিয়েছে। বাড়িতে বাড়িতে চলছে ঐতিহ্যবাহী বাৎসরিক নবান্ন উৎসব পালনের প্রস্তুতি।

এদিকে এবার হেমন্তের শুরুতেই ঘরে উঠছে আগাম জাতের ধান। নির্ধারিত সময়ের আগেই পাকা ধান যেমন ঘরে উঠছে,  তেমনি সেই ধানের ফলনও হয়েছে তুলনামূলক ভালো। এছাড়া চালের বাজার দর হিসেবে নতুন ধানের বাজার দরেও খুশি কৃষকরা। তবে বাদ সাধছে ধান কাটার শ্রমিকরা। দ্বিগুণ টাকায় তাদের দিয়ে ধান কাটাতে হচ্ছে।

এ প্রসঙ্গে উপজেলা কৃষি অফিসার খাজানুর রহমান জানান, আগাম জাতের যে ধান কৃষকের ঘরে উঠছে, এর ফলন আশাব্যঞ্জক হয়েছে। এছাড়া আগামী দুই সপ্তাহ পর উপজেলা জুড়ে পুরোদমে ধান কাটা ও মাড়াই শুরু হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.