পল্লীবিদ্যুতের ১৬ হাজার কর্মীর মরণদশা : অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতিতে গ্রাহকদের বিল প্রদান বন্ধ

polli-bidyutএফ শাহজাহান :: সারাদেশে পল্লীবিদ্যুৎ সমিতির ১৬ হাজার কর্মীর মরণদশা চলছে। গত ৬দিন ধরে চলছে তাদের অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতি ও অবস্থান ধর্মঘট। সংস্থার উর্ধতন কর্মকর্তাদের চরম জুলুম নির্যাতনের শিকার এই হতভাগা কর্মীদের কৃতদাসের মত খাটিয়ে নেয়া হলেও তাদের মানুষ মনে করছেন না কর্তারা। দীর্ঘদিন ধরে কর্তৃপক্ষের বেআইনি কারবার এবং বিরাজমান নির্যাতনের শিকার এই বনী আদমেরা এবার বাধ্য হয়ে দুর্বার আন্দোলনে নেমেছেন। হয় মরন,না হয় মানুষের মত বেঁচে থাকার আশা নিয়ে এবার তারা চরম সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করছেন।

জীবন জীবীকার দাবিতে তাদের সকল কাঁকুতি মিনতি ব্যর্থ হবার পর সারাদেশে আমরণ আন্দোলন শুরু করেছেন। গত ৭ নভেম্বর থেকে একটানা চলছে তাদের অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতিসহ অবস্থান ধর্মঘট। এতেকরে সংস্থায় চরম অচলাবস্থার সৃষ্টি হলেও টনক নড়ছে না কর্তৃপক্ষের। কর্মীদের ন্যায়সঙ্গত অধিকার আদায়ের আন্দোলন থামাতে এবার তারা হুমকী ধামকীর পথ বেছে নিয়েছেন।

আন্দোলনরত কর্মীদের বগুড়া জেলা সভাপতি আমিনুল ইসলাম জানান, আজ ৬ দিন ধরে আমরা পথে বসে আছি,অথচ আমাদের জিএম একবার দেখাও করেন নি। উল্টা কর্মীদের চলমান আন্দোলন থেকে সরানোর জন্য চাকুরীচ্যুতমহ ফৌজদারী মামলার হুমকী দিচ্ছেন। তিনি জানান আমাকে সহ আমাদের কর্মী মো: বাবুল হোসেন,মো: জাহাঙ্গীর আলম,মো: রবিউল করিম,মো: মনিরুল ইসলামকে নোটিশ দিয়েছেন বগুড়া পল্লীবিদ্যুৎ সমিতির জিএম। আন্দোলনরত কর্মীকে ফৌজদারী মালায় ফাঁসানোর হুমকীও দেয়া হচ্ছে। এতেকরে কর্মীদের মধ্যে চাপা ক্ষোভ বিরাজ করছে। যে কোন সময় এই ক্ষোভের বহি:প্রকাশ ঘটলে ভয়াবহ পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে বলে আশংকা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সারাদেশে পল্লীবিদ্যুৎ সমিতির ১৬ হাজার চুক্তিভিত্তিক মিটার রিডার ও মেসেঞ্জার রয়েছেন। এরা সবাই চাকুরী জীবনের শুরু থেকেই নির্যাতিত হচ্ছেন। দেশের স্বায়ত্তশাসিত কোনো প্রতিষ্ঠানে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া আইনত অবৈধ হলেও দিনের পর দিন বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের (আরইবি) অধীনে ১৬ হাজার চুক্তিভিত্তিক মিটার রিডার ও মেসেঞ্জার কাজ করছেন। আইন অমান্য করে প্রতিষ্ঠানটির কর্তা ব্যক্তিরা কোটি কোটি টাকার পাহড় গড়ছেন আর কর্মীরা পরিবার পরিজন নিয়ে অনাহারে দিন যাপন করছেন। চুক্তিভিত্তিক হওয়ায় কর্তার নির্দেশে যেকোনো সময় চাকরি চলে যায় এসব দরিদ্র মিটার রিডার ও মেসেঞ্জারের।

সম্প্রতি আরইবি খরচ কমানোর উদ্যোগ নিয়েছে। আর এ কারণে চুক্তিভিত্তিক এসব মিটার রিডার ও মেসেঞ্জারের চাকরি চলে যাচ্ছে। গত কয়েক মাসে বহু মিটার রিডার ও মেসেঞ্জারের চাকরি চলে গেছে।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, এ পরিস্থিতিতে যদি হাজার হাজার মিটার রিডার চাকরিহীন হয়ে পড়েন মধ্য বয়সে, তবে এক মানবেতর পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে। কারণ মিটার রিডারের প্রায় সবাই অত্যন্ত দরিদ্র ও মাঝবয়সী। এ বয়সে অন্য কোনো চাকরি জোগাড় করাটাও তাঁদের জন্য কঠিন হয়ে পড়বে। এ রকম পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার কোনো পরিকল্পনা আদৌ আছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাব নেই আরইবি কর্তৃপক্ষের।

আরইবির সাম্প্রতিক নেওয়া সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির মিটার রিডারদের অনুমোদিত পদের বিপরীতে সাত হাজার ৮১০ জন কাজ করছেন। এখানে দুই হাজার ৮৮৫টি মিটারের বিপরীতে একজন মিটার রিডার। অন্যদিকে মেসেঞ্জারদের অনুমোদিত পদ সাত হাজার ৯৬৪ জনের বিপরীতে ছয় হাজার ৭৫ জন কাজ করছেন। দুই হাজার ৫১৫টি মিটারের বিপরীতে একজন মেসেঞ্জার এখন দায়িত্ব পালন করছেন। আরইবির নির্বাহী পরিচালককে প্রধান করে গঠিত চার সদস্যের একটি কমিটি চার হাজার মিটারের বিপরীতে একজন মিটার রিডার এবং পাঁচ হাজার মিটারের বিপরীতে একজন মেসেঞ্জার রাখার সুপারিশ করে। আরইবি এই সুপারিশ অনুমোদন করলেই চাকরিহারা মানুষের তালিকা লম্বা হতে থাকে। এখন চাকরি হারানো এসব মানুষ চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছেন। দীর্ঘদিন ধরে তারা তাদের দুরবস্থার কথা বলে আসলেও কর্তৃপক্ষ তাদের কোন কথাই  শোনেন নি।এখন তাদের দেয়ালে পীঠ ঠেকে যাওয়ায় বাধ্য হয়ে অনির্দিষ্ঠকালের কর্মবিরতি শুরু করেছেন। সেই সঙ্গে চলছে অবস্থান ধর্মঘট।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে আরইবির চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) মঈন উদ্দিন বলেন, ‘ এই খাতে  আমাদের এত লোকবলের প্রয়োজন নেই, সেই লোকবলকে কেন প্রতিষ্ঠান রাখবে? তাদের বসিয়ে রেখে তো বেতন নেওয়ার সুযোগ নেই।সেই জন্যই বাড়তি জনবল ছাঁটাই করছি।’এটি একটি চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ। মাত্র তিন বছরের জন্য মিটার রিডারদের চুক্তির মাধ্যমে নিয়োগ দেওয়া হয়। তিন বছর পর চুক্তির মেয়াদ বাড়ানো বাধ্যতামূলক নয়।’

সরকার ২০১৩ সালে শ্রম আইন সংশোধন করে পাস করে। সংশোধিত শ্রম আইনে কোনো স্থায়ী প্রতিষ্ঠানে অস্থায়ী কোনো শ্রমিক নিয়োগ দেওয়া যাবে না। কোনো শ্রমিক শিক্ষানবিশের তিন মাস পার হওয়ার পরও কনফারমেশন লেটার নাও দেওয়া হয় তবে ওই শ্রমিককে স্থায়ীকরণ করা হয়েছে এমনটি বলে গণ্য হবে। শ্রম আইন অনুযায়ী, আরইবির মতো একটি স্থায়ী প্রতিষ্ঠানে অস্থায়ী চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়ার সুযোগ নেই। তবে বেআইনি এ কাজ বছরের পর বছর করে যাচ্ছে আরইবি। চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের সুযোগ নিচ্ছে আরইবি। জীবনের শেষ সময়ে এসেও অনেকে হারাচ্ছেন চাকরি।

প্রশ্ন উঠেছে,কোনো ব্যক্তি ৫৫ বছর চাকরি করবে চুক্তিভিত্তিক বা অস্থায়ী হিসেবে, এটি বাংলাদেশের প্রচলিত আইনে এটা কী করে সম্ভব ? কিন্তু দিনের পর দিন  সেই বেআইনি কাজটিই করে যাচ্ছেন আরইবি’র কর্তা ব্যক্তিরা। তাদের ভাবভঙ্গি দেখে দেশের প্রচলিত আইন কানুনকে তারা থোড়াই কেয়ার করেন।

সংশ্লিষ্ট একটি সুত্র জানায় মিটার রিডার ও মেসেঞ্জারদের এই অমানবিক জুলুম নির্যাতন এবং কথায় কথায় চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়ার পরিকল্পনার পেছনে আরইবির ১২ জন কর্মকর্তা রয়েছেন । তাদের কথায় উঠবস করছে গোটা বোর্ড। এরফলে চরম অস্থিরতা বিরাজ করছে এই সংস্থায়।

আরইবির মিটার রিডার ও মেসেঞ্জাররা চাকরি থেকে বরখাস্ত হওয়ার প্রতিবাদে গত ৭ নভেম্বর থেকে দেশব্যাপী চরম আন্দোলন চলছে। সারাদেশেই চলছে অনির্দিষ্ট কালের কর্মবিরতি এবং অবস্থান ধর্মঘট।

আন্দোলনরত কর্মীদের কেন্দ্রীয় সভাপতি আমজাদ হোসেন বকুল জানান,কর্তৃপক্ষ আমাদের মানুষ মনে করেন না। আমাদেরও যে মৌলিক অধিকার আছে সেটা তারা স্বীকার করে না। চাকরী জীবনের শুরু থেকেই তাদের জুলুমে শিকার হয়ে আসছি। বহুকিছু করে তাদের বুঝানোর চেষ্টা করেছি যে মানুষ হিসেবে আমাদের ন্যুন্যতম চাহিদা গেিলার দিকে নজর দেস। তারা কোন কথাই শোনেনি। এখন একেবারে আমরা নিরুপায় হয়ে এমন কঠোর আন্দোলনে নামতে বাধ্য হয়েছি। এবার আমরা হয় মরবো,না হয় ন্যায় সঙ্গত অধিকার আদায় করেই ঘরে ফিরবো।

অসহায় এসব কর্মীরা বলেছেন, তাদের বিরুদ্ধে ফৌজদারী মামলা করার হুমকী দিচ্ছেন জিএম। চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হবে বলেও তাঁদের হুমকি দেওয়া হচ্ছে। ভুক্তভোগীরা দাবি করছেন তাঁদের হুমকি-ধমকি দেওয়া হচ্ছে, কোনো আন্দোলনে গেলে গণছাঁটাই করার হুমকি দেওয়া হচ্ছে। যেহেতু চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ, তাই সংগত কারণে পরিবার-পরিজন নিয়ে পথে বসার ভয়ে কথাও বলতে পারছেন না অনেকে।

আরইবি চেয়ারম্যান মঈন উদ্দিন চাকরি থেকে বরখাস্ত করার বিষয়টি মানতে নারাজ। তিনি বলেন, ‘চুক্তি শেষ হয়ে যাওয়ায় তাঁদের চাকরি চলে যাচ্ছে। যেহেতু এখন অতিরিক্ত লোকবলের প্রয়োজন নেই সে কারণে তাঁদের নেওয়া যাচ্ছে না। কর্মীদের আন্দোলন প্রসঙ্গে তিনি কোন কথা বলতে রাজি হন নি।

সারা দেশে প্রতিদিনই কোনো না কোনো মিটার রিডার ও মেসেঞ্জারের চাকরি হারাচ্ছেন। বগুড়া ,নওগাঁ,নাটের,রংপুর,দিনাজপুর, রাজশাহী,বরিশালসহ সারাদেশের কর্মীরাই এখন কর্মবিরতি পালন করছেন। সম্প্রতি রংপুরে আরইবির মিটার রিডার ও মেসেঞ্জাররা কাফনের কাপড় মাথায় পেঁচিয়ে রংপুর-ঢাকা মহাসড়কের লালদীঘি নামক স্থানে প্রায় তিন কিলোমিটার দীর্ঘ ওই মানববন্ধন করেন।

সারাদেশেই  মিটার রিডার ও মেসেঞ্জাররা চুক্তি নবায়নের জন্য আন্দোলন করছেন। আন্দোলনকারীরা পল্লীবিদ্যুৎ সমিতির কর্মকর্তাদের কাছে তাঁদের দাবি জানিয়ে স্মারকলিপি পেশ করেছেন। আন্দোলনরত এসব মিটার রিডার ও মেসেঞ্জার চাকরি হারানোর আশঙ্কা করছেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.