বছরে অর্ধকোটি টাকা রাজস্ব বঞ্চিত হচ্ছে কাজিপুরের ১২টি ইউনিয়ন

05কাজিপুর (সিরাজগঞ্জ) টি এম কামাল : সিরাজগঞ্জের নদী বিধৌত কাজিপুর উপজেলার ১২টি ইউনিয়ন পরিষদ ট্রেড লাইসেন্সবিহীন কুঠির শিল্প, ক্ষুদ্র কলকারখানা ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান থেকে বছরে প্রায় কোটি টাকার রাজস্ব বঞ্চিত হচ্ছে। এ কারণে স্থানীয় সরকারের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা এলাকার উন্নয়ন কর্মকান্ডসহ নাগরিক সেবার মানের দিকে খেয়াল দিতে পারছেনা।

স্থানীয় সরকারের অন্যতম স্তর হচ্ছে ইউনিয়ন পরিষদ। তৃণমূল পর্যায়ে সাধারন মানুষের সাথে সরকারের সরাসরি যোগাযোগ রক্ষার এই স্তর থেকে সরকারের নানামুখী কর্মকান্ডের সুফল জনগণ পেয়ে থাকে। নির্দিষ্ট সময় পর নির্বাচিত চেয়ারম্যান ও সদস্যবৃন্দসহ পরিষদে কর্মরত ব্যক্তিরা সরকারের অংশ হিসেবে ইউনিয়নের সার্বিক কর্মকান্ড দেখভাল করেন।

বর্তমান সরকার র্তণমূল পর্যায়ে সেবা পৌঁছে দিয়ে দেশকে এমডিজি অর্জনের দিকে নেয়ার লক্ষ্যে সর্বশেষ ২০০৯ সালের ১৫ অক্টোবর স্থানীয় সরকার আইনের গেজেট প্রকাশ করেন। বিশেষ করে প্রযুক্তিগত উৎকর্ষতা বাড়াতে প্রতিটি ইউনিয়ন পরিষদকে ইন্টারনেট সেবার আওতায় নিয়ে এসেছেন।

সেই সাথে ইউনিয়ন পরিষদের নিজস্ব আয় বাড়িয়ে একে আত্মনির্ভর প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু উপজেলার ইউনিয়নগুলোর বাস্তব প্রেক্ষাপট বলছে ভিন্ন কথা। এখনো স্থানীয় সরকার আইনের যথাযথ প্রয়োগ ইউনিয়নগুলোতে হচ্ছে না। ফলে স্থানীয় সরকার বছরে মোটা অংকের রাজস্ব আয় থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। ইউনিয়নবাসি পাচ্ছেনা আশানুরুপ নাগরিক সুযোগ সুবিধা। উন্নয়ন কর্মকান্ড থেকে পড়ছে পিছিয়ে।

সরেজমিনে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, উপজেলার সোনামুখী, চালিতাডাঙ্গা, শিমুলদাইড়, মেঘাই নতুন বাজার, পুরাতন বাজার, আলমপুর, কালিকাপুর, উদগাড়ি, ভানুডাঙ্গা, হরিনাথপুর হাট, হরিনাথপুর বাজার, স্থলবাড়ি, গান্ধাইল, সীমান্তবাজার, মাথাইলচাপড়, ঢেকুরিয়া, ছালাভরা, কুনকুনিয়া, চরাঞ্চলের মনসুর নগর, কুমারিয়াবাড়ি ও নাটুয়াপাড়া হাট সহ জনবহুল স্থানে প্রায় সাত হাজার ব্যবসা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এছাড়া মাইজবাড়ি, চালিতাডাঙ্গা ও সোনামুখী ইউনিয়নের প্রায় ১০টি গ্রামে বিদ্যুৎ চালিত তাঁত (পাওয়ারলুম) ও হস্ত চালিত তাঁত শিল্প গড়ে উঠেছে। ছালাভরা, শিমুলদাইড় বাজার কম্বল বাজার হিসেবে ইতোমধ্যে সারাদেশে সুনাম কুড়িয়েছে।

শীত মৌসুমে প্রতিদিন কয়েক লাখ টাকা করে কম্বল এই বাজারে বিক্রি হয়। অথচ এই খাত যেমন কোন পর্যায় থেকে পায়নি কোন সাহায্য তেমনি এর উৎকর্ষ সাধনের মাধ্যমে এখান থেকে মোটা অঙ্কের টাকা বছরে আয়ের চিন্তাও কেউই করছে না। নিয়মানুযায়ী সকল ব্যবসা পরিচালনার জন্য ইউনিয়ন পরিষদ থেকে ট্রেড লাইসেন্স নিতে হয়। পরিষদে নির্ধারিত ফি জমা দিয়ে প্রতি বছর ট্রেড লাইসেন্সগুলো নবায়ন করতে হয়।

প্রতিটি ট্রেড লাইসেন্স ফি সর্বনিম্ন ২০০ টাকা। ব্যবসার ধরণ অনুযায়ী ফি আরো বাড়ানোর বিধান রয়েছে। সেই হিসেবে উপজেলার ৭ হাজার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে গড়ে ৫০০ টাকা হারে বছরে প্রায় অর্ধকোটি টাকা রাজস্ব আয় হবার কথা। এছাড়া ইউনিয়ন পরিষদের নিবন্ধন নিয়ে বেসরকারি বা ব্যক্তিগত টিউটোরিয়াল স্কুল, কোচিং সেন্টার, প্রাইভেট চিকিৎসা কেন্দ্র পরিচালনা করার বিধান রয়েছে। সেখান থেকেও একটা আয় আসার কথা।

তাছাড়া খাসজমি, সরকারি জলাশয়, কোলা ,ঘাট এসব বন্দোবস্তের মাধ্যমে প্রায় কয়েক লাখ টাকা আয় করা সম্ভব। কিন্তু  ইউনিয়ন পরিষদগুলোর নিস্ক্রিয়তায় প্রতিষ্ঠানের মালিকরা সরকারি রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে অবাধে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে।
নিবন্ধন বিহীন প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ২০০৯ সালের স্থানীয় সরকার আইনের ৮৪ ধারায় আর্থিক দন্ডের বিধান রয়েছে। কিন্তু এসব আইনের কোন প্রয়োগ ইউনিয়ন পরিষদগুলোতে হচ্ছে না।

ফলে বছরের পর বছর ধরে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান থেকে ইউনিয়ন পরিষদ রাজস্ব আয় পাচ্ছে না। এলাকার বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মালিকের সাথে কথা বলে জানা যায়, চেয়ারম্যান বা ইউপি সদস্যগণ ট্রেড লাইসেন্স ফি আদায়ে তেমন আগ্রহ দেখায় না। ব্যবসায়ীদের রাজস্ব প্রদানের বিষয়ে উৎসাহিতকরণে তারা কোন পদক্ষেপই নেন না। সোনামুখী বাজার বিজনেস এ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ডাঃ শহিদুল ইসলাম বলেন, ট্রেড লাইসেন্স বিষয়ে ব্যবসায়ীদের ধারনা কম।

যারা একটু বোঝেন, তাদের ধারণা চেয়ারম্যান-মেম্বররা এই লাইসেন্সের অর্থ জনস্বার্থে ব্যবহার করেন না। এক্ষেত্রে জনপ্রতিনিধি ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে সমন্বহীনতার অভাব রয়েছে।

কাজিপুরের ২নং চালিতাডাঙ্গা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আতিকুর রহমান মুকুল বলেন, ব্যবসায়ীদের আগে থেকেই ট্রেড লাইসেন্স না করার মানসিকতা রয়েছে। তবে বিষয়টি নিয়ে ব্যবসায়ীদের সাথে আলোচনা করা হবে। অনেক ব্যবসায়ী এরই মধ্যে লাইসেন্স করতে শুরু করেছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.