স্মৃতিতে অম্লান একজন ক্যাপটেন মনসুর আলী

mansurকাজিপুর (সিরাজগঞ্জ) থেকে টি এম কামাল : বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার রূপকার বঙ্গবন্ধুর আদর্শের যোগ্য সহচর কাজিপুর-সিরাজগঞ্জ-পাবনার জনগনের কাছে ক্যাপটেন সাব নামে পরিচিত এম মনসুর আলী। স্বাধীকার থেকে স্বাধীনতার লাল সূর্যকে ছিনিয়ে আনতে এই প্রবাদ পুরুষ নিজের জীবনকে বিলিয়ে দিয়ে যোগ্য নেতৃত্বের এক অনুপম উদাহরন আমাদের মাঝে রেখে গেছেন। সমাজের সর্বস্তরের মানুষ তার সান্নিধ্য একান্ত আপনজন হিসেবে পেয়েছেন।

তৎকালিন পাবনা জেলার সিরাজগঞ্জ মহকুমার কুড়িপাড়া গ্রামে ১৯১৭ সালে এম মনসুর আলীর জন্ম। তার কৈশোর ও শৈশব কেটেছে  প্রমত্তা যমুনার ভাঙ্গা-গড়ার ছবি দেখে। কাশবনের সাদা আর উর্বর পলির সবুজ-সোনালি ফসলের হাসি তাকে মোহবিষ্ট করে রেখেছে। এই দুই সত্তা তাকে গণমানুষের নেতা হতে সহায়ক হয়েছে। তিনি সিরাজগঞ্জ বিএল স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাশ করে পাবনা এডওয়ার্ড কলেজে আইএ ভর্তি হন। সেখানে পড়া অবস্থায় পদ্মার অপরূপ সৌন্দর্য তাকে মুগ্ধ করে।

আর এই মুগ্ধতার পরিমান এতই বেশি ছিল যে, শেষ পর্যন্ত কোলকাতা ইসলামিয়া কলেজ থেকে বিএ এবং আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে এম এ ডিগ্রি লাভের পরেও তিনি ব্যক্তিগত জীবন শুরু করেন পাবনাতেই। বুদ্ধিদীপ্ত ক্যাপটেন মনসুর পাবনা কোর্টে আইনজীবি হিসেবে ব্যক্তিগত জীবন শুরু করেন। মানুষের ভালোবাসা কিভাবে শত কণায় ফিরিয়ে দেয়া যায় সে বিষয়েও মনসুর ছিলেন সচেতন। তারই ফলশ্রুতিতে ১৯৪৬ থেকে ৫০ সাল পর্যন্ত তিনি পাবনা জেলা মুসলিম লীগের সহ-সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন।

এই সময়ে তিনি লীগের নিজস্ব গার্ড বাহিনীর ক্যাপটেন ছিলেন। সেই ক্যাপটেন পদবীই শেষ পর্যন্ত তার নামের সঙ্গে নিবিড়বাবে জড়িয়ে গেছে। ১৯৫১ সালে ক্যাপটেন মনসুর আলী আওয়ামীলীগে যোগ দেন। ১৯৫৩-৬৬ সাল এবং ১৯৭২-৭৫ সাল পর্যন্ত আওয়ামীলীগের কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য ছিলেন। বঙ্গবন্ধুর যোগ্য সহচর হিসেবে পালন করেছেন অর্থমন্ত্রী, স্বারাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব। স্বাধীনতার পতাকাকে ছিনিয়ে আানতে রাখেন বলিষ্ট ভূমিকা।

১৯৫২ সালের ফেব্রুয়ারি মাস। ঢাকার রাজপথে রাষ্ট্রভাষার দাবি তখন জমে উঠছে। ক্যাপটেন মনসুরের নেতৃত্বে পাবনা জেলায় সে আন্দোলন দানা বেধে ওঠে। পাকিস্তান সরকার তখন তাকে গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠায়। ১৯৫৪ সালে জনগণের কথা বলার সুযোগের আশায় যুক্তফ্রন্টের টিকিটে পূর্ববঙ্গ সভার সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৫৬ সালে কোয়ালিশন সরকারের পর্যায়ক্রমে সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী, খাদ্য-কৃষি, বানিজ্য-শ্রম ও শিল্পমন্ত্রির দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৫৮ সালে সামরিক আইন জারি হলে তিনি গ্রেফতার হন। গণমানুষের ক্যাপটেনকে গ্রেফতারের প্রতিবাদে ফুঁসে ওঠে পাবনার আপামর জনগন।

মিছিল-মিটিংয়ে রাজপথ প্রকম্পিত হতে থাকলে ’৫৯ সালের শেষ দিকে তিনি ছাড়া পান। এরপর ৬ দফা আন্দোলনে তার ছিল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। ১৯৬৮ সালের তিনি আওয়ামীলীগের সহ-সভাপতি নির্বাচিত হন। এরপর উনসত্তরের গণঅভ্যূথানে তিনি বিশেষ ভূমিকা পালন করেন। সত্তরের নির্বাচনে তিনি পাবনা-০১ আসন থেকে প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৭১ সালে ১৭ এপ্রিল মুজিব নগরে সরকার গঠিত হলে তিনি সেখানে অর্থমন্ত্রীর মতো গুরুত্বপূর্ন মন্ত্রীত্ব লাভ করেন। দেশ স্বাধীন হবার পর বঙ্গবন্ধুর মন্ত্রীসভায় তিনি প্রথমে যোগাযোগ মন্ত্রী, পরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হন।

১৯৭৩ সালের নির্বাচনে তিনি নির্বাচিত হন। এরপর রাষ্ট্রপতি শাষিত সরকার চালু হলে তিনি প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭৫ সালে তিনি বাকশালের সেক্রেটারি জেনারেল পদ পান। শুরু হয় চক্রান্ত। মোস্তাক গংদের অপতৎপরতা আর বিশ্বাসঘাতকতায় বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলায় নেমে আসে ঘোর অমানিশা। ৭৫ এর ১৫ আগষ্ট সপরিবারে নিহত হন বঙ্গবন্ধু। গ্রেফতার হন জাতীয় চার নেতার অন্যতম নেতা ক্যাপটেন এম মনসুর আলী। খন্দকার মোস্তাক প্রেসিডেন্ট হয়ে নজর দেন মনসুর আলীর দিকে। কিন্তু তিনি ছিলেন অটল। এরপর ৩ নভেম্বর জেলখানায় ঢুকে খুনিরা অন্য নেতাদের সাথে মনসুর আলীকে গুলি করে ও বেয়নেট চার্জ করে হত্যা করে।

এরপর মোস্তাকের মসনদ ভেঙ্গে যায়। ৭ নভেম্বর ঘটে আরেকটি দুঃজনক ঘটনা। সবশেষ এদেশের স্বাধীনতা পাগল জনগণ আবারো বঙ্গবন্ধু কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনাকে দ্বিতীয়বারের মতো ক্ষমতায় বসিয়েছে। বাবা মনসুর আলী একসময় সিরাজগঞ্জের কাজিপুরের নাম শুনেই যেমন করে চাকরি দিয়েছেন তেমনি অনেক স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসা করে চাকুরির সংস্থান করেছেন মোহাম্মদ নাসিম। এমনি করে তানভীর শাকিল জয় নেতৃত্বে কাজিপুর এগিয়ে যাবে এটাই কাজিপুরবাসির আশা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.