সরকারি হাসপাতালে বেসরকারি সেবা: প্রজনন স্বাস্থ্য সুরক্ষায় আরএইচ স্টেপ’র চার দশক


এফ শাহজাহান : বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের প্রধান ফটক দিয়ে বহির্বিভাগে ঢুকতেই চোখে পড়ে আরএইচস্টেপ ক্লিনিক। প্রথমেই চোখ ছানাবড়া অবস্থা। হাসপাতালের মধ্যে ক্লিনিক ? তাও আবার সরকারি হাসপাতালে বেসরকারি ক্লিনিকের কাজ কি ? সেই কৌতুল মেটাতেই ভেতরে প্রবেশ এবং সেখান থেকেই জানতে পারা আরএইচস্টেপ নামের এই বেসরকারি সংস্থার পরিবার পরিকল্পনা এবং নিরাপদ যৌন ও প্রজনন স্বাস্থসেবার চার দশকের অভিজ্ঞতার গল্প।
সরকারি হাসপাতালে বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা কথাটা শুনতে কিছুটা নতুন মনে হলেও আদতে কাজটা নতুন নয়। প্রায় চার চল্লিশ বছর ধরে দেশের সরকারি হাসপাতালগুলোতে নিরবে পরিবার পরিকল্পনা সেবা, নিরাপদ যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্যসেবা দিয়ে যাচ্ছে রিপ্রোডাক্টিভ হেলথ সার্ভিসেস ট্রেনিং অ্যান্ড এডুকেশন প্রোগ্রাম। সংক্ষেপে আরএইচস্টেপ নামে পরিচিত এই বেসরকারি সংস্থাটি দেশের সবগুলো মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আস্থার সঙ্গে পরিকল্পনা সেবা, নিরাপদ যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্যসেবা দিয়ে ব্যাপক সুনাম অর্জন করছে।
শুধু নিরাপদ যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্যসেবা কিংবা পরিবার পরিকল্পনা সেবা দিয়েই কাজ শেষ করেনি আরএইচস্টেপ। তাদের কর্মসুচীর একটা বড় অংশ জুড়ে আছে বয়:সন্ধিকালের কিশোর-কিশোরীদের মানসিক ও স্বাস্থ্য সমস্যার সমাধান এবং কিশোর-কিশোরীদের সুন্দর ভবিষ্যৎ নির্মানে সচেতনতা সৃষ্টিমুলক কর্মসুচীগুলো ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছে। এছাড়াও বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে আরএইচস্টেপ এর স্কুলভিত্তিক কর্মসুচীগুলো ইতমধ্যেই সারাদেশে কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে খুবই গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে।স্কুল শিক্ষাথীদের মধ্যে বয়:সন্ধিকালীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং বালবিবাহ প্রতিরোধের কে নতুন চেতনার জন্ম দিতে সক্ষম হয়েছে আরএইচস্টেপ।
দেশের মোট জনসংখ্যার এক চতুর্থাংশ কিশোর-কিশোরী। এই কিশোর-কিশোরীদের বয়:সন্ধিকালের নানা স্বাস্থ্য সমস্যা তাদের ভবিষ্যৎ জীবন গঠনে খুবই গ্ররুত্বপূর্ণ প্রভাব বিস্তার করে। এসময় তারা ভুল করলে সারা জীবন সেই ভুলের মাশুল দিতে হয়। সেজন্য এসময় তাদের স্বাস্থ্য সচেতনতা সারা জীবনের জন্য সুফল বয়ে আনে। আরএইচস্টেপ সেই কিশোর-কিশোরীদের জীবন বদলে দেওয়ার কাজটিই সুচারুভাবে করে যাচ্ছে।
মোটাদাগে আরএইচস্টেপ যে কাজগুলো করে সফলতা পেয়েছে, সেগুলো দি”েচ সেগুলো হচ্ছে,যেকোন শারিরিক ও মানসিক সমস্যায় কাউন্সেলিং,মেয়েদের মাসিক নিয়মিতকরণ(এমআর),গর্ভপাত জটিলতায় চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা,গর্ভকালীন এবং প্রসব পরবর্তী পরিচর্যা,পরিবার পরিকল্পনা পরামর্শ ও পদ্ধতি সরবরাহ,যৌন ও প্রজননতন্ত্রের সংক্রমন চিকিৎসা,কৈশর ও যুববান্ধব স্বাস্থ্যসেবা এবং সাধারন স্বাস্থ্যসেবা প্রদান।
আরএইচস্টেপ অধিকাংশ স্বাস্থ্যসেবাই বিনামুল্যে দিয়ে থাকে। এছাড়াও তারা নামমাত্র মুল্যে ডায়াগনোস্টিক সবা প্রদান করে। আরএইচস্টেপ এর ক্লিনিক ল্যাবে আল্ট্রাসনোগ্রাম,রক্তের বিভিন্ন পরীক্ষা,প্রসাবের বিভিন্ন পরীক্ষা,জরায়ুমুখ ক্যান্সার পরীক্ষা,স্তনক্যান্সার(ম্যানুয়েল)পরীক্ষা করা হয় খুবই অল্পমুল্যে। একজন রোগীর যে সব পরীক্ষা বাইরে করতে ৮ থেকে ১০ হাজার টাকা খরচ হয়,সেইসব পরীক্ষা আরএইচস্টেপ এ করতে ২ থেকে ৩ হাজার টাকার মত খরচ হয়। এছাড়াও গরীব ও দুস্থ নারীদের জন্য নামমাত্র মুল্যে সব ধরনের চিকিৎসা সেবা প্রদান করে আরএইচস্টেপ।
আরএইচস্টেপ সারাদেশে জনসচেতনতা সৃস্টিতে নানা রকম ওয়ার্কশপ,অ্যাডভোকেসি সভা এবং ক্যাম্পেইন পরিচালনা করলেও তৃণমুল পর্যায়ের প্রান্তিক জনগোষ্টী তাদের এই সেবা সম্পর্কে এখনো তেমন কিছুই জানেন না। যারা বিভিন্ লোক মারফত অবগত হয়েছেন তাদের অনেকেই আরএইচস্টেপ এর সঙ্গে ঘনিষ্ট সম্পর্ক রেখেছেন। বগুড়া কাহালু উপজেলার প্রত্যন্ত এলাকা থেকে স্বাস্থ্যসেবা নিতে আসা এমনই একজন নারী সুফিয়া বেগম জানালেন, তার এলাকার কমপক্ষে ২০ জন নারী আরএইচস্টেপ এর পরামর্শ ও স্বাস্থ্যসেবায় স্তন ক্যান্সারের ভয় থেকে এখন মুক্ত এবং কমপক্ষে ৩০ জন নারী জরায়ুমুখ ক্যান্সারের বিপদ থেকে সুস্থ হয়ে উঠেছেন।
নারীদের মাসিক নিয়মিতকরণ বা এমআর এর নিরাপদ ব্যবস্থাপনায় আরএইচস্টেপ নারীদের কাছে অনেক আগেই আস্থা অর্জন করছে। পরিবার পরিকল্পনা সেবা প্রদানও আরএইচস্টেপ অন্যান্য যে কোন বেসরকারি সংস্থার চেয়ে অনেক বেশি অস্থা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে। সরকারি হাসপাতালের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে কাজ করার কারনে সাধারন মানুষের আস্থা যেমন তাদের প্রতি বেড়েছে,তেমনি বিনামুল্যে এবং খুবই স্বল্পমুল্যে ব্যায়বহুল চিকিৎসা সেবা পাওয়ায় অল্প আয়ের মানুষের কাছে আরএইচস্টেপ এক ধরনের বিবপদের বন্ধ ুহসিবে পরিগনিত হচ্ছে।
বিগত চার দশকে আরএইচস্টেপ এর সাফল্য এই স্বল্প পরিসরের প্রতিবেদনে উলে।লখ করা সম্ভব নয়। তবে মোটা দাগে আরএইচস্টেপ যে কাজটা করতে পেরেছে তা হলো দেশের এক চতুর্থাংম জনগোষ্ঠী কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে নিরাপদ যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্যরক্ষার সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুরতে সক্ষম হয়েছে। এছাড়াও বাল্যবিবাহের মত অভিশাপ থেকে জাতিকে মুক্ত করার ক্ষেত্রেও আরএইচস্টেপ কিমোর-কিশোরী,যুবক যুবতী এবং সমাজের বিভন্ন শ্রেণিপেশার মানুশের মধ্যে ব্যাপক সচেতনতা সৃুষ্ট করতে সক্ষম হয়েছে।
বিশেষ করে পরিবার পরিকল্পনা সেবা দানে আরএইচস্টেপ এর পদ্ধতি সাধারন মানুষ সহজেই গ্রহণ করতে পেরেছে। এজন্য আরএইচস্টেপ এর কাছে অনেকেই নির্বিঘেœ এসে তাদের প্রয়োজনীয় সেবা নিতে পারছেন। আর সরকারি হাসপাতালের সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়ার কারনে আরএইচস্টেপ এর কাছে আসতে সাধারন মানুষও বেশ স্বাচ্ছন্দবোধ করছেন।
অনেকেই জানেন না যে সরকারি হাসপাতালে আরএইচস্টেপ নামের একটি বেসরকারি সংস্থার ক্লিনিকে সহজে এবং সস্তায় উন্নত মানের চিকিৎসাসেবা পাওয়া যায়। যত মানুস এই সেবার কথা জানবে তত মানুষ বেশি উপকৃত হব।এজন্য আপনি পাঠক হিসেবেও এই বিষয়টির প্রচারণা চালালে গ্রামীন সহজ সরল,সাধারন নারীরা সহজেই উন্নত,ানের স্বাস্থ্যসেবা নিয় সুস্থ জীবন যাপন করতে পারবে।
দেশের সবগুলো মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল,গুরুত্বপূর্ণ জেলা সদরের সরকারি হাসপাতালসহ সারাদেশে১১টি আরএইচস্টেপ ইবিআর ক্লিনিক এবং যুবাবান্ধব সেবাকেন্দ্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে আরএইচস্টেপ স্বাস্থ্যসেবার সম্ভাবনাময় যে নতুন দিগন্ত উম্মোচন করেছে, তা আগামীতে আরো অনেক নতুন নতুন সাফল্যের দ্বার উম্মোচন করে দিবে এটাই প্রত্যাশা করেন সেবাগ্রহীতারা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.