করোনায় কাজে লাগবে বাংলার গেরিলা গাছ বিছুটি

হাকীম এফ শাহজাহান : বাবা আমাদের বাড়িতে এলাকার মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয় দিয়ে প্রতিদিন নানা ঘটনার মুখোমুখি হতেন। সময় পেলেই তিনি আমাকে মুক্তিযুদ্ধের সময়কার নানান গল্প শোনাতেন।

তিনি বলতেন, পাক হানাদার বাহিনী বাংলাদেশে এসে গেরিলা যোদ্ধাদের মুখোমুখি হয়ে যখন দিশেহারা,তখন তারা বুদ্ধি বের করলো যে , ঝোপজঙ্গলে লুকিয়ে থেকে প্রাণরক্ষা করবে ।

তো, এসময় অনেক পাক সেনা জঙ্গলের মধ্যেই প্রাকৃতিক কর্ম সেরে গাছ লতাপাতা না চেনার কারনে বিছুটি পাতা দিয়ে শৌচকর্ম করার পর যখন প্রচন্ড জ্বালাপোড়া শুরু হতো, তখন চিৎকার করে কাপড়-চোপড় আর অস্ত্রপাতি ফেলে দৌড়াতে দৌড়াতে বলতো-
ইয়ে বাঙ্গালকা আদমী বহুত খতরনাক। গাছের পাতার ভেতরেও গেরিলা যোদ্ধা লুকিয়ে আছে।

কেই কেউ বলতেন, বাংলার গাছ লতাপাতাও গেরিলা যোদ্ধা।

সেই কিশোর বয়সে বাবার কাছে এসব শোনার পর থেকেই বিছুটি গাছের প্রতি একটা ভালোবাসা জন্মেছিল। ভাবতাম বিছুটি পাতারও প্রবল দেশপ্রেম আছে। তারাও দেশের স্বাধীনতার জন্য পাক হানাদারদের জায়গামত অস্ত্র দাগিয়েছে।

সেই থেকে মাথায় একটা দুষ্টুমিও চাপলো। স্কুলে গোপনে গোপনে বিছুটি পাতা নিয়ে গিয়ে মেয়েদের বসার বেঞ্চে,হাত রাখার জায়গায় বিছুটি পাতা ঘসে রাখতাম।

তারপর সব ইতিহাস।

বদ মেজাজী শিক্ষকদেরকেও মাঝেমধ্যে নাস্তানাবুদ করার জন্য আমরা কয়েকজন বখাটে মিলে মাঝেমধ্যে বিছুটি থেরাপি প্রয়োগ করে বেশ ফল পেতাম।

তারপর তো অনেক কিছুই বদলে গেছে। সেইসাথে বদলেছে বিছুটি পাতার ইতিহাসও।

একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সেই গেরিলা বিছুটি পাতা আজ আমার কাছে এক অসাধার ওষুধি গাছ ।

বিছুটি গাছের শিকড়, রাইজোম এবং পাতার রস ওষুধি গুণে ভরপুর।

এতে আছে ট্যানিন, ফাইবার, ক্লোরোফিল রাসায়নিক উপাদান। এ ট্যানিন, ফাইবার, ক্লোরোফিল, বেরিয়াম, পটাশিয়াম এবং ক্যালসিয়াম।

বিছুটিতে আরো আছে লোহা, বোরন, মলিবডিনাম, স্ট্রনটিয়াম, সেলেনিয়াম, তামা, ম্যাঙ্গানিজ, টাইটানিয়াম, নিকেল ও অ্যাসকরবিক ।

এর পাতায় যে পরিমাণ ভিটামিন সি আছে তা ১০ গ্রাম কিশমিশের সমান বা একটি গাজরের অর্ধেক।

বিছুটি পাতার গায়ে আছে মানুষের রোগ সারানোর অনেক উপাদান। এই করোনাকালেও বিছুটি পাতা আমাদে অনেকটাই সুস্থ রাখতে পারে।

বিশেষ করে যরো কার্ডিয়াক এ্যাজমায় ভুগছেন তারা করোনাকালে খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। এসময় বিছুটিপাতা আপনাকে সুস্থ রাখবে।

অনবরত হাঁচি দেয়ার সমস্যা করোনাভাইরাস সংক্রমনের একটা অন্যতম আলামত। এসমস্যায় পড়লে বিছুটি পাতার রস আপনার ঘনঘন হাঁচি পড়া নিরাময় করবে।

অসহ্য কাশি,শ্বাসকষ্ট এবং হাঁপানি এই করোনাকালের সবচেয়ে বড় আতংকের নাম। এসব সমস্যায় বিছুটি ব্যবহার করলে আপনি দ্রুত ফল পাবেন।

বিছুটি শুধু করোনার উপসর্গ নিরাময়েই কাজ করে না এর অসাধারন সব নানা ওষুধিগুন রয়েছে।

বিছুটি পাতা ব্যথা নাশক হিসেবে দারুণ কাজ করে।
এর এন্টিসেপ্টিক উপাদান শরীরের যে কোনো অংশের ব্যথা কমাতে যাদুর মতো কাজ করে। তাছাড়া এটি রক্তাল্পতা, ফুসফুস এবং অন্ত্রের অভ্যন্তরীণ রক্ত ক্ষরণ কমায়।

এই উদ্ভিদের নির্যাস জরায়ুর রক্ত ক্ষরণ বন্ধ করে এবং স্ত্রীরোগে কাজ করে।

এতে থাকা অ্যাসট্রিনজেন্ট একজিমা, পোকার কামড়, পক্স কমাতে সাহায্য করে। বিভিন্ন চর্মরোগেওষুধ হিসেবে বিছুটি পাতার তেল বহুলভাবে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। এর শিকড়ের রস মূত্রবর্ধক এবং রক্তপরিষ্কারক।

ভেষজ বিজ্ঞানে বিছুটিকে কসমেটিক ভেষজ বলা হয়। সৌন্দর্যচর্চায় এর বহুল ব্যবহার রয়েছে।চুল পড়া কমাতে এর জুড়ি নেই। এই পাতার মধ্যে থাকা সিলিকন ও সালফার চুল ঘন করতে সহায়তা করে।

ক্রনিক হেপাটাইটিস, গ্যাস্ট্রিক আলসার ভালো হয়। এটি পিত্ত থলি এবং যকৃতের বিভিন্ন রোগ ভালো করে। ত্বকের ব্রণের সমস্যা দূর করতে বিছুটি পাতা অনেক কার্যকরী।

কোথায় পাবেন ?
গাছটির খোঁজ প্রথমে রাশিয়াতে পাওয়া গেলেও, এখন এটি বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান ও আফ্রিকা মহাদেশসহ আরো বেশ কয়েকটি দেশে পাওয়া যায়।

কীভাবে ব্যবহার করবেন ?
সর্দি-কাঁশি সারাতে বিছুটি গাছের শিকড় এবং চিনি একসঙ্গে একগ্লাস পানিতে জ্বাল করে অর্ধেক থাকতে নামিয়ে ছেঁকে নিয়ে পান করুন।

ফুসফুসের সমস্যা,শ্বাসকষ্ট হাঁপানি সারাতে ফুটন্ত পানিতে বিছুটি পাতা দিয়ে চা তৈরি করুন এবং দিনে ২ থেকে ৩ বার এই চা পান করুন।

বিছুটির শুকনা পাতার গুঁড়া সরিষা তেলের সঙ্গে মিশিয়ে ব্যাথার স্থানে প্রলেপ দিলে ব্যাথা উপশম হবে।

বিছুটি পাতা শুকিয়ে গুঁড়া করে পেস্ট বানিয়ে এই পেস্ট হালকা কুসুম গরম পানিতে ভিজিয়ে ব্রণের উপর লাগালে ভাল হয়ে যাবে।

চুলের সৌন্দর্য বাড়াতে এক মগ পানিতে এই পাতা ফুটিয়ে ছেঁকে, ঠান্ডা করে শ্যাম্পু করার পর মাথায় দিয়ে ধুয়ে নিন ।

বিছুটি পাতার রস কিংবা তেল কুসুম গরম করে বাতের ব্যথা এবং হাড়ের জয়েন্টের ব্যথায় মালিশ করলে খুব দ্রুত ফল পাবেন।

সতর্কতা :
উপরের গল্পের কথা মনে রাখুন। শরীরের কোথাও যেনো কাঁচা বিছুটি পাতরে স্পর্শ না লাখে খেয়াল রাখুন।
ভেষজ ওষুধ সেবনে মাত্রার প্রতি খেয়াল রাখুন।

সুস্বাস্থ্যের সুখবর
[ শেফা স্মার্ট হাসপাতালের সৌজন্যে পরিবেশিত ]

হাকীম এফ শাহজাহান
ডিইউএমএস
হামদর্দ ইউনানী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল,বগুড়া।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.