১১ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আয়ের পথ দেখালেন তামাকবিরোধীরা

স্টাফ রিপোর্টারঃ বাজেটে তামাক পণ্যের মূল্য ও কর বৃদ্ধি এবং সারচার্জ আরোপ করে আরও ১১ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আয়ের পথ দেখিয়েছেন তামাকবিরোধীরা। তারা বলছেন, ওই অর্থ আয় করা সম্ভব হলে বাজেট বাস্তবায়নে ব্যাংক ঋণের নির্ভরতা কমানোর পাশাপাশি করোনাভাইরাস মোকাবেলায় থোক বরাদ্দ বাড়ানোও সম্ভব হবে।

গত অর্থবছরে তামাক খাত থেকে প্রায় ২৭ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আয় হয়। এবার সিগারেটের মূল্যস্তর কমানো, বিড়ির ফিল্টার ও নন-ফিল্টার মূল্য বিভাজন তুলে দেওয়া, ধোঁয়াবিহীন তামাক পণ্যের (জর্দা ও গুল) সম্পূরক শুল্ক বৃদ্ধি এবং সব তামাক পণ্যের খুচরা মূল্যের ওপর ৩ শতাংশ হারে সারচার্জ আরোপ করে অতিরিক্ত ১১ হাজার কোটি টাকারও বেশি রাজস্ব আয় করা সম্ভব বলে জানিয়েছেন তারা।

এর মধ্যে তামাক-কর ও মূল্য বৃদ্ধি থেকে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা পর্যন্ত এবং ৩ শতাংশ সারচার্জ থেকে প্রায় ১ হাজার কোটি টাকা বাড়তি রাজস্ব আয় অর্জন করা সম্ভব বলে হিসাব দিয়েছেন তারা। তামাকবিরোধী সংগঠন প্রজ্ঞা ও অ্যান্টি টোব্যাকো মিডিয়া অ্যালায়েন্স-আত্মাসহ তামাকবিরোধী বিভিন্ন সংগঠন সোমবার বাজেট পরবর্তী এক ভার্চুয়াল আলোচনার আয়োজন করে। আলোচনায় অংশ নেন জাতীয় তামাকবিরোধী মঞ্চের আহ্বায়ক ড. কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ, বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ, টিভি টুডে’র এডিটর ইন চিফ মঞ্জুরুল আহসান বুলবুল, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের সিনিয়র রিসার্চ ফেলো ড. নাজনীন আহমেদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. রুমানা হক এবং ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্রাটেজিক স্টাডিজের (বিআইআইএসএস) রিসার্চ ডিরেক্টর ড. মাহফুজ কবীর।

খলীকুজ্জমান আহমদ বলেন, “আমরা বার বার বলছি তামাকের ক্ষতি থেকে মানুষকে রক্ষার জন্য তামাক পণ্যের কর ও মূল্য বাড়াতে হবে। কিন্তু সেটার বাস্তবায়ন হচ্ছে না। আমাদের উন্নয়ন দর্শন এখন বাজার অর্থনীতি নির্ভর হয়ে গেছে সুতরাং জনস্বাস্থ্য অগ্রাধিকার পাচ্ছে না। তবে আমরা তামাকপণ্যের দাম বৃদ্ধির কথা বলেই যাব।” খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ বলেন, “বাজেট অর্থায়নে ব্যাংকিং খাতের উপর অতিমাত্রায় নির্ভরতা অর্থনীতির জন্য মোটেও ভালো নয়। সরকারের হাতে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে বাড়তি রাজস্ব আহরণের একটি সুযোগ রয়েছে। আমরা দেখলাম, তামাকপণ্য থেকে অতিরিক্ত ১১ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায় সম্ভব, যা বাজেট অর্থায়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে। মঞ্জুরুল আহসান বুলবুল বলেন, “মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ২০৪০ সালের মধ্যে তামাকমুক্ত বাংলাদেশ অর্জনের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছেন। কিন্তু যারা এটা বাস্তবায়ন করবেন সেই নীতিনির্ধারকদের সদিচ্ছার অভাব রয়েছে।

“এবারের বাজেট ঘোষণার সময় বলা হয়েছে, এটি জীবন বাঁচানোর বাজেট। কিন্তু প্রায় ৪ কোটি তামাক ব্যবহারকারীর জীবন রক্ষার কোনো উদ্যোগ এই বাজেটে নেই।” বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের (বিআইডিএস) সিনিয়র রিসার্চ ফেলো অর্থনীতিবিদ নাজনীন আহমেদ বলেন, “তামাক পণ্যের কর ও দাম বাড়ানোর সবচেয়ে বড় সুফল হচ্ছে তরুণ প্রজন্মকে তামাক ব্যবহার শুরু করা থেকে নিরুৎসাহিত করা। আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, দরিদ্র মানুষের তামাক ব্যবহারের স্বাস্থ্য ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার সামর্থ্য অনেক কম। সুতরাং দাম বৃদ্ধির মাধ্যমে তাদেরকেও তামাক পণ্য ব্যবহারে নিরুৎসাহিত করা হলে এটা তাদের জন্য উপকারই হবে।

” অর্থনীতির অধ্যাপক রুমানা হক বলেন, “সিগারেটের মূল্য স্তর সংখ্যা না কমানো এবং গুলের দাম প্রত্যাশিত মাত্রায় বৃদ্ধি না করায় মানুষের মধ্যে তামাক ব্যবহার কমবে না। অন্যদিকে তামাকপণ্যে সুনির্দিষ্ট কর আরোপ না করায় তামাক কোম্পানির লাভ বেড়ে যাচ্ছে। আমি আশা করব, চূড়ান্ত বাজেটে আমাদের প্রস্তাব অনুযায়ী তামাক পণ্যে সুনির্দিষ্ট করারোপসহ দাম ও সম্পূরক শুল্ক বৃদ্ধি করা হবে।” ভার্চুয়াল এই আলোচনায় মূল প্রবন্ধ পাঠ করেন প্রজ্ঞার কো-অর্ডিনেটর মো. হাসান শাহরিয়ার।

এটিএন বাংলার নিউজ এডিটর নাদিরা কিরণের সঞ্চলানায় এই অনুষ্ঠানে সিগারেটের মূল্যস্তর চারটি থেকে দুটিতে নামিয়ে আনাসহ বিড়ির ফিল্টার এবং নন-ফিল্টার মূল্য বিভাজন তুলে দেওয়া, জর্দা ও গুলের সম্পূরক শুল্ক বৃদ্ধি করার পাশপাশি সব তামাকপণ্যের খুচরা মূল্যের ওপর ৩ শতাংশ হারে সারচার্জ আরোপ করার দাবি তুলে ধরে তা চূড়ান্ত বাজেটে পাশ করার দাবি জানানো হয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.