1. aknannu1964@gmail.com : AK Nannu : AK Nannu
  2. admin@asianbarta24.com : arifulweb :
  3. angelhome191@gmail.com : Mahbubul Mannan : Mahbubul Mannan
  4. info@asianbarta24.com : Dev Team : Dev Team
বৃহস্পতিবার, ০২ ফেব্রুয়ারী ২০২৩, ০২:১৯ অপরাহ্ন

অমর কথা শিল্পী পন্ডিত নজিবর রহমান সাহিত্যরত্নের ৯৯তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ

  • আপডেট করা হয়েছে : মঙ্গলবার, ১৮ অক্টোবর, ২০২২
  • ৭৩ বার দেখা হয়েছে

এম. দুলাল উদ্দিন আহমেদ:
মুসলিম পুণজাগরনের ভোরের মুয়াজ্জিম ও বাংলা সাহিত্যের লোকায়ত অমর কথা শিল্পী পন্ডিত নজিবর রহমান সাহিত্যরত্নের ৯৯তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ। অমর এই কথা শিল্পী ১৯২৩ খ্রিস্টাব্দের (১৮ অক্টোবর) এ দুনিয়া থেকে চিরো বিদায় নিয়েছেন। সিরাগঞ্জের সলঙ্গা থানার হাটিকুমরুল ইউনিয়নের হাটিপাড়া গ্রামের নিজ বাড়িতে চিরনিদ্রায় স্বায়িত আছেন বাংলা সাহিত্যের কিংবদন্তীর এই মহাপুরুষ নজিবর রহমান সাহিত্যরত্ন। এমনকি সাহিত্যরত্নকে যেখানে সমাহিত করা হয়েছে সে সমাধি স্থানটি আজোও সংস্কারের জন্য সরকারী ও বেসরকারী ভাবে কোন উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। সে স্থানটি পড়ে আছে অযত্ন আর অবহেলায়। তবে ব্যক্তি উদ্যোগে সংস্কার করে একটু সৌন্দর্য বর্দ্ধন করা হয়েছে। নজিবর রহমান সাহিত্যরত্নের স্মৃতি ধরে রাখতে নজিবর রহমান সাহিত্যরত্ন একাডেমি সিরাজগঞ্জ’র পক্ষ থেকে সিরাজগঞ্জে ও তার পরিবারের পক্ষ থেকে তার সমাধীস্থল সলঙ্গা থানার হাটিকুমরুল ইউনিয়নের হাটিপাড়া গ্রামে প্রতি বছরের এই দিনে তাকে গভীর শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করে নানা কর্মসুচীর মাধ্যমে মৃত্যুবার্ষিকী পালন করা হয়। আজোও তার মৃত্যুবার্ষিকীকে ঘিরে আলোচনাসভা ও কবর জিয়ারতসহ নানা কর্মসুচী গ্রহণ করা হয়েছে।অত্যন্ত দুঃখ ও পরিতাপের বিষয় হলেও বাস্তব সত্য যে,স্থানীয় ভাবে সাহিত্যরত্ন নজিবর রহমানের নামে একটি স্মৃতি পাঠাগার করা হলেও তা আজো আলোর মুখ দেখেনি। উপরন্ত যারা পাঠাগারের নামে জায়গা দান করে ছিলেন শেষ পর্যন্ত তারা সে জায়গাটিও অমানবিক ভাবে কেঁড়ে নিয়েছেন। সবচেয়ে হৃদয় বিদারক হচ্ছে আজ পর্যন্তও আমরা জাতিগত ভাবে এতটুকু শ্রদ্ধাও জানাইনি অমর এই কথা শিল্পীর প্রতি। অমর এই কথা শিল্পীর জীবনেও যেমন থেকেছেন উপেক্ষিত তেমনি মরণেও রয়েগেছেন উপেক্ষিত ও অজ্ঞাত। তিনি যে সাহিত্য ভান্ডার রেখে গেছেন যদি তার গ্রন্থস্বত্ত্ব তার উত্তরাধিকারদের মধ্যে থাকতো তাহলে হয়তো বিধ্বস্ত এই পরিবারের সদস্যরা আজ একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে পারতেন।

জ্ঞান তাপস নজিবর রহমান সাহিত্যরত্ন ১৮৬০ খ্রিস্টাব্দের ২২ জানুয়ারী সিরাজগঞ্জ জেলার শাহজাদপুর উপজেলার চরবেলতৈল গ্রামে জন্ম গ্রহণ করেন। তার পিতার নাম ছিল জয়েন উদ্দিন আহমেদ ও মাতার নাম ছিল সোনাভান। তার পিতা-মাতা উভয়েই ছিলেন ধর্মপরায়ন ও ন্যায় নিষ্ঠাবান। কাজেই পিতা-মাতার আদর্শ বুকে ধারন করে তিনিও ছিলেন নম্র,ভদ্র,বিনয়ী,আদর্শবান ও শান্ত প্রকৃতির। অত্যন্ত শান্ত প্রকৃতির নজিবর রহমান বাল্যকালে তার চাচার অনুপ্রেরনায় স্থানীয় স্কুলেই পাঠ্য জীবন শুরু করেন এবং ছাত্র বৃত্তি লাভ করেন। পরবর্তীতে তার পিতার ইন্তেকালের পর তিনি নিজের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় ঢাকার একটি সাধারণ স্কুলে ভর্তি হন এবং সেখান থেকে তিনি কৃতিত্বের সাথে ত্রৈ-বার্ষিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। এভাবে সফলতার সাহিত শিক্ষা জীবন পারি দিয়ে কর্ম জীবন শুরু করেন তিনি। তথ্যানুসন্ধানে জানা যায় যে, বার বার তার স্ত্রী মৃত্যুর কারণে তিনি মোট চারটি বিয়ে করেন। প্রথম চব্বিশ বছর বয়সে তিনি নিজ গ্রামে মুন্সি মোহাম্মদ ইসমাইল হোসেনের কন্যা সাহেরা ভানু (সাবান বিবি)’র সাথে পরিনয় সুত্রে আবদ্ধ হন। প্রথম স্ত্রী নিঃসন্তান অবস্থায় মারা গেলে কুড়িগ্রামের কোন এক সৈয়দ পরিবারের আমেনা খাতুন নামে এক মহিলাকে বিয়ে করেন। এই স্ত্রীর গর্ভে এক কন্যা ও গোলাম বতু নামে এক পুত্র জন্ম গ্রহন করেন। এই স্ত্রী জীবিত থাকা অবস্থায় তিনি সিরাজগঞ্জ জেলার বেলকুচি উপজেলার তামাই গ্রামে তৃতীয় বিয়ে করেন। এই স্ত্রীর গর্ভে জাহানারা ও রওশনারা বেগম নামে দুই কন্যা ও মীর মোহাম্মাদ হায়দার আলী নামে এক পুত্রের জন্ম হয়। দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্ত্রীর মৃত্যুর পর পঞ্চাশোর্ধ বয়সে তিনি রহিমা খাতুন নামে এক মহিলাকে বিয়ে করেন। তার এই শেষ স্ত্রীর গর্ভে পুত্র হাবিুবর রহমান ও মমতাজ নামে এক কন্যা জন্ম গ্রহন করেন। উল্লেখ্য যে, তার প্রথম পুত্র মীর গোলাম বতু কলকাতার রিপন কলেজ থেকে বাংলায় অনার্স পাশ করেছিলেন কিন্তু পরীক্ষার ফল বের হবার পুর্বেই গোলাম বতু কলেরায় আক্রান্ত হয়ে মারা যান। এটাই ছিল সাহিত্যরত্ন নজিবর রহমানের জীবনে চরম আঘাত।

কর্মজীবনে তিনি শিক্ষকতাকে পেশা হিসেবে বেঁছে নিয়েছিলেন। তাছাড়া বেলকুচি উপজেলার কান্ত কবি রজনী কান্ত সেনের নিজ গ্রাম সেনভাঙ্গাবাড়ির মধ্য বাংলা মডেল ছাত্র বৃত্তি স্কুলের একটি ডাকঘরের পোষ্ট মাষ্টারের দায়িত্ব পালন করেন। তিনি সলঙ্গায় মাইনর শিক্ষকতা করাকালিন সময়ে তাড়াশের প্রতাপশালী জমিদার রায় বাহাদুর বনমালী রায়ের রোষ দৃষ্টিতে পতিত হন। পন্ডিত নজিবর রহমান বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে স্বদেশী আন্দোলনের তীব্রতায় ও অসহযোগ আন্দোলনের কারণে এদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিমন্ডলে যখন ব্যাপক অস্থিরতা বিরাজ করছিল তখন সাহিত্যরত্ন নজিবর রহমান ছিলেন স্বদেশী আন্দোলনের অকুতোভয় সৈনিক। হিন্দু জমিদারের বিরুদ্ধে পরিচালিত বিভিন্ন আন্দোলনে তিনি নেতৃত্ব দেন। মুসলমানদের সংগঠিত করার জন্য সলঙ্গাতে তিনি আঞ্জুমান ই-ইসলাম নামে একটি সমিতি গঠন করেছিলেন। জমিদার রায় বাহাদুর পন্ডিত নজিবর রহমানকে হত্যা করার জন্য চলনবিল এলাকার কুখ্যাত কালু খাঁ নামক একজন ডাকাতকে নিযুক্ত করেছিলেন বলে জানা যায়। এই সময় স্থানীয় মুসলমান জমিদার মুন্সি এলাহী বক্সের সরাসরি হস্তক্ষেপে ও আর্থিক সহায়তায় তিনি সলঙ্গার অনতিদুরে হাটিকুমরুলের হাটিপাড়া এলাকায় বসতবাড়ি স্থাপন করেন এবং জীবনের শেষ দিন গুলি এখানেই তিনি অতিবাহিত করেন। সেই সময়ে নজিবর রহমান সাহিত্যরত্ন মোট ১১টি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন।

নজিবর রহমান সাহিত্যরত্ন বাংলা সাহিত্যাকাশে এক উজ্জল নক্ষত্র। যে সময়ে মুসলমান সমাজে বাংলা শেখা নিষিদ্ধ ছিল, সেই সময়ে তিনি রচনা করেন আনোয়ারা, প্রেমের সমাধি, গরীবের মেয়ে, পরিনাম,মেহেরুন্নেসা,বেহেস্তের ফুল। তার রচিত রাজনৈতিক গ্রন্থ বিলাতী বর্জন রহস্য ১৯০৪ সালে বৃটিশ সরকার কর্তৃক বাজেয়াপ্ত হয়। চাঁদতারা বা হাসান গঙ্গা বাহামনি তার ঐতিহাসিক উপন্যাস। এছাড়াও পাঁচটি গল্পের সমন্বয়ে “দুনিয়া আর চাইনা” সমাজ চিত্রের ছোট গল্পের বই। আনোয়ারা উপন্যাস খানি বাংলা সাহিত্য জগতে আলোড়ন সৃষ্টিকারি একটি সামাজিক উপন্যাস হিসাবে ঘরে ঘরে আজও সমাদৃত। বই খানা ইতিপুর্বে চলচিত্রায়ন হয়েছে ও বাংলাদেশ টেলিভিশনে নাট্যরূপ প্রদর্শিত হয়েছে। ১৯১২ সালে বইটি প্রথম প্রকাশিত হয়। প্রথম প্রকাশ থেকে ১৯৮৭ সাল পর্যন্ত এর প্রায় ৫ লক্ষ কপি বিক্রি হয়েছে বলে এক পরিসংখ্যানে জানা গেছে। ১৯৫৬ সালে বইটির ২৬তম মুদ্রণ প্রকাশ পায়। পাঠক নন্দিত বই খানি সাহিত্যরত্নের প্রিয় ছাত্র ওয়ায়েদ আলী মাষ্টারের বাড়িতে বসে রচনা করেন বলে শ্রুতি স্বাপেক্ষে জানা গেছে। দীর্ঘদিন সাহিত্য সাধনায় নিমগ্ন থাকার পর ১৯২৩ সালে ১৮ই অক্টোবর (বাংলা ১৩৩০ সালের ১লা কার্তিক) এ জ্ঞান তাপস পৃথিবী থেকে চির বিদায় নেন। তাকে তার হাটিকুমরুলের বসতবাড়ির সামনে সমাহিত করা হয়। সমাধি ক্ষেত্র জঞ্জালাকীর্ণ উপেক্ষিত।

নজিবর রহমান সাহিত্যরত্ন আমাদের যে সাহিত্য ভান্ডার দিয়ে গেছেন আমরা তা অকৃতজ্ঞের মত শুধু গ্রহণ করেছি,প্রতিদান তাকে বা তার উত্তরাধিকারদের দেইনি। তার মৃত্যুর পর ১৯৪৪ সালে তার ওয়ারিশগন আনোয়ারাসহ আরো পাঁচটি বইয়ের গ্রন্থ স্বত্ত্ব মাত্র ১৯৫০ টাকার বিনিময়ে ওসমানিয়া বুক ডিপোর মালিকের নিকট বিক্রি করে দেন। সেই সময় থেকে আজতক আট দশক অতিবাহিত হয়েছে। কপিরাইট আইনানুসারে দশ বছর পর বিক্রিত গ্রন্থ স্বত্ত্ব পুনরায় লেখকের বরাবর ফিরে আসে। কিন্তু বড়ই পরিতাপের বিষয় নজিবর রহমান সাহিত্যরত্নের উপন্যাস গুলির বিক্রির গ্রন্থ স্বত্ত্ব দীর্ঘ দিন পরও তার ওয়ারিশগন ফেরত পাননি। এ ব্যাপারে ষাটের দশকে সাহিত্যরত্নের পুত্র মীর হাবিবুর রহমান ও কন্যা রওশনারার স্বামী মফিজ উদ্দিন, ডাঃ মোহাম্মদ শহিদুল্লাহ,কবি জসিম উদ্দিন,ডাঃ মোহাম্মদ এনামুল হক,কবি গোলাম মোস্তফা, কবি আব্দুল কাদির, কবি খান মোহাম্মদ মঈনুদ্দিন,অধ্যক্ষ ইব্র্রাহিম খা ও অধ্যাপক মনসুর উদ্দিনের সহযোগীতায় তদানিন্তন পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানের স্বরণাপন্ন হন। সে সময় আইয়ুব খান সাহেব এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় নির্দেশও দিয়েছিলেন কিন্তু রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের কারণে এক অশুভ শক্তির অদৃশ্য হস্তক্ষেপে সেই আবেদনের সেই ফাইলটি উধাও হয়ে গেছে। পুত্র মীর হাবিবুর রহমান ও কন্যা রওশনারা মারা গেলেও তাদের সন্তানেরা বেঁচে আছেন। তারা আজ দরিদ্রতার নির্মম কষাঘাতে পতিত। দেশের এতো বড় একজন জ্ঞান তাপসের উত্তরাধিকারদের এতো টুকু কৃতজ্ঞতা আমরা দেখাইনি এমনকি কোন শান্তনার বানিও আমরা তাদের শুনাইনি। দেশ আজ স্বাধীন, দেশের কৃষ্টি-কালচার, সাহিত্য সবই স্বতন্ত্র বৈশিষ্টের দাবিদার জাতিগত ভাবে আমরা নজিবর রহমান সাহিত্যরত্নের কাছে ঋণি।

তাই আমরা বিধ্বস্ত নজিবর রহমান সাহিত্যরত্নের পরিবারবর্গের পক্ষ থেকে দেশের সরকারের প্রতি বিনীত আবেদন রাখি যদি কবি নজরুল ইসলামকে ও তার পরিবারবর্গকে আমরা যথাযথ সম্মান দেখাতে পারি,যদি কবি গুরু রবিন্দ্রনাথ ঠাকুরের শাহজাদপুরের রবিন্দ্র কাচারি বাড়ী সৌন্দর্য্য বর্ধনের জন্য কোটি কোটি টাকা ব্যয় করতে পারি তাহলে সেই দিকটি বিবেচনা করে বাংলা সাহিত্যাকাশের এই উজ্জল নক্ষত্র জ্ঞান তাপস নজিবর রহমান সাহিত্যরত্নের কবর সংস্কার এবং তার সৌন্দর্য্য বর্ধনসহ বিধ্বস্ত পরিবার বর্গের প্রতি যদি সরকারী বা বেসরকারী ভাবে একটু সহযোগিতার হাত প্রসারিত করতে পারি তাহলে জাতি তথা নজিবর রহমান সাহিত্যরত্নের বিদেহী আত্মা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে পারে। সাহিত্যরত্ন নজিবুর রহমান মারা যাননি,তিনি বেঁচে আছেন আমাদের অন্তরে এবং তিনি বেঁচে থাকবেন অনন্তকাল। মৃত্যুবার্ষিকীর এই দিনে বাংলা সাহিত্যের কাল পুরুষ নজিবর রহমান সাহিত্যরত্নের আত্মার প্রতি গভীর শ্রদ্ধাঞ্জলি জ্ঞাপন করে এভাবে শেষ করছি ‘‘হে বিরাট নহিতব ক্ষয়,নিত্য নব-নব দানে ক্ষয়েরে করেছো তুমি জয়’’।

লেখক: সাংবাদিক,সাহিত্যিক ও সাধারণ সম্পাদক, নজিবর রহমান সাহিত্যরত্ন একাডেমি’সিরাজগঞ্জ।

বন্ধুদের মাঝে শেয়ার করুন

এরকম আরও বার্তা
স্বত্ব © ২০১৫-২০২২ এশিয়ান বার্তা  

কারিগরি সহযোগিতায় Pigeon Soft